গল্প

ইতি

মোশতাক আহমেদ
| আপডেট : ১৯ জুন ২০২০, ১০:৫৮ | প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০২০, ১০:২৯

স্যার, মালা নিবেন, ফুলের মালা?

কবির সাহেব গাড়ির জানালা খুললেন। ওপাশে মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স এগারো বারো হবে। হাতে বকুল ফুলের মালা। কবির সাহেব মানিব্যাগ থেকে একশ টাকা বের করে মেয়েটিকে দিলেন। মেয়েটি সাথে সাথে সবগুলো মালা তার দিকে এগিয়ে দিল। কবির সাহেব বেছে বেছে দুটি মালা নিলেন।

ট্রাফিক সিগন্যালের বাতি সবুজ হলে গাড়ি চলতে শুরু করল। জানালার কাচ তুলে দিলেন কবির সাহেব। তারপর মালা দুটোকে নাকের কাছে নিয়ে এলেন। সত্যি অপূর্ব গন্ধ!

মেয়েটি ধানমন্ডির এই মোড়ে ফুলের মালা বিক্রি করছে বছর দুয়েক হলো। এই দুই বছরের প্রায় প্রতিদিনই ফুল কিনেন কবির সাহেব। মোড়টিতে এলেই তার চোখ মেয়েটিকে খুঁজতে থাকে। মেয়েটির নাম ইতি। একেবারে নিস্পাপ চেহারার মেয়ে। দেখতে খুব সুন্দর। সাধারণত যে সকল মেয়ে রাস্তায় ফুল বিক্রি করে তারা এতটা সুন্দর হয় না। অথচ এই মেয়েটি সুন্দর, দারুন সুন্দর।

কবির সাহেব অনুভব করেন ইতির জন্য তার মধ্যে এক ধরনের টান সৃস্টি হয়েছে। বাসায় ফিরে আসার সময় ছাড়াও দিনের বিভিন্ন সময় ইতির কথা মনে পড়ে। ইতি কোথায় থাকে, ওরা কয় ভাই বোন, ওর বাবা মা কী করে এই বিষয়গুলো কখনো জানা হয়নি তার, অথচ জানতে ইচ্ছে করে। একদিন নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, সেই থেকে তিনি জানেন মেয়েটির নাম ইতি। মাঝে মাঝে কুশলাদি বিনিময় হয়, কথা বলতে এইটুকুই।

পেশায় কবির সাহেব একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী বললে ভুল হবে, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। বয়স কেবল চল্লিশ পার হয়েছে। এই বয়সে সমাজের অনেক উপরে উঠে এসেছেন তিনি। ধানমন্ডিতে তিনি যে ডুপ্লেক্স বাড়িতে থাকেন এরকম বাড়ি খুব কম ব্যবসায়ীরই আছে। কিন্তু এ বাড়িতে তিনি ছাড়া আর তেমন কেউ থাকে না। আছে শুধু তার ড্রাইভার, বাবুর্চি আর দারোয়ান। বিশাল বাড়িটা বলতে গেলে একেবারে ফাঁকা। ফাঁকা থাকার কারণও আছে। তিনি জীবনে বিয়ে করেননি। জীবনটাকে নিজের মতো করে কাটিয়ে দিচ্ছেন। হাতে টাকা আসার পর জীবন উপভোগের নামে বিভিন্ন রেস্ট হাউস, হোটেল, রিসোর্টে এক একদিন একএকজন সঙ্গীনিকে নিয়ে গিয়েছেন। ফলে নিজেকে এক নারীর আঁচলে আটকে রাখার পরিকল্পনা তিনি কখনো করতে পারেননি। তাও যতটুকু ছিল সেটা শেষ হয়ে গিয়েছে প্রযোজক হিসেবে কিছু ছবিতে লগ্নি করার পর। না চাইতেই অনেক কিছু পেতে শুরু করেছেন তিনি।

জীবনের এ পর্যায়ে এসে তার মনে হচ্ছে জীবনটা এখনকার মতো হওয়া উচিত হয়নি। অবশ্যই তার সংসার করা উচিত ছিল। হওয়া উচিত ছিল সন্তানের বাবা। ইদানিং বেশ নিঃসঙ্গতায় ভুগেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরলে অস্থির লাগে। বাসার বাইরেও ভালো লাগে না। আজ তার অর্থের অভাব নেই, নেই সঙ্গীনিরও। হোটেল কিংবা রেস্টহাউসে যাকে ইচ্ছে তাকে তিনি পেতে পারেন। মাঝে কায়েকবার নাটক বানানোর কথা বলে সিঙ্গাপুর আর থাইল্যান্ডও ঘুরে এসেছেন, সাথে পছন্দের নায়িকাও ছিল। কিন্তু কেমন যেন সবকিছু একঘেয়েমি লাগে। এর পিছনে অবশ্য কারণও আছে, তার বন্ধু কিংবা সঙ্গীদের সব ভালোবাসাই কৃত্রিম। তিনি অনুধাবন করেন, তার চারপাশের মানুষগুলো তার কাছে শুধু অর্থের জন্যই আসে, প্রকৃত ভালোবাসার জন্য নয়।

তবে তাকে যে কেউ কোনোদিন ভালোবাসেনি তা কিন্তু নয়। আট নয় বছর আগের কথা, তার এক গার্লফ্রেন্ড ছিল। মাস তিনিকের মতো সম্পর্ক ছিল তাদের। মেয়েটি তাকে বড় ভালোবাসত। তিনি তাকে চলে যেতে বললেও যেতে চায়নি সে। তারপর একসময় চলে গিয়েছিল, আর তা চিরদিনের জন্য, আত্মহত্যা করে। আজ কেন যেন কবির সাহেবের মনে হচ্ছে মেয়েটিকে বিয়ে করলে মন্দ হতো না। মেয়েটি সুন্দরী ছিল, বেশ সুন্দরী। তার থেকে বড় কথা সে তাকে ভালোবাসত। এরকম আরও অনেকে তাকে ভালোবেসেছিল, কেউ প্রকাশ করতে পেরেছে, কেউ পারেনি। বলা না বলার সেই মানুষগুলো আজ হারিয়ে গেছে হাজারও মানুষের ভিড়ে।

০২

গত বেশ কয়েকদিন হলো ইতিকে দেখননি কবির সাহেব। অথচ ট্রাফিক সিগন্যালে এলেই তিনি খুঁজতে থাকেন ইতিকে। ফুলের মালাও কেনা হয় না তার। যে ফুলের মালাগুলো তিনি ইতির কাছ থেকে কিনেন সেগুলো তিনি নিজের বেডরুমে রাখেন। ফুলগুলোর গন্ধ রুমটাকে সবসময় সুবাসিত করে রাখে। এজন্য কেন যেন তার মনে হয়, ইতি তার সাথেই আছে, তার বাড়িতেই আছে। মনের গভীরের এই অনুভূতিটা দারুন ভালো লাগে তার।

ট্রাফিক সিগন্যালে আজ হঠাৎই ইতিকে দেখতে পেলেন তিনি। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে। কারণ আজ সে শাড়ি পড়ে এসেছে। চমৎকার হলুদ রঙের শাড়ি। হলুদের মধ্যে ফর্সা মুখটাকে আরও ফর্সা লাগছে। এজন্য দেখতে যেন বেশি সুন্দর লাগছে।

জানালার কাচ নামিয়ে কবির সাহেব ফুলের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে ইতি অদ্ভুত একটা কাজ করল। হাতের সবগুলো ফুল দিয়ে দিল কবির সাহেবকে। কবির সাহেব অবাক হয়ে বললেন, এত ফুল তো আমার দরকার নেই?

ইতি মিষ্টি হেসে বলল, নিয়া যান।

কবির সাহেবও মিষ্টি হাসলেন, তারপর বললেন, তুমি আজ প্রথম শাড়ি পড়েছ। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। আমি কী তোমার একটা ছবি তুলতে পারি?

ইতি উপরে নিচে মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিল।

কবির সাহেব মোবাইল ফোনে ইতির বেশ কয়েকটি ছবি তুললেন। তারপর মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে সিগন্যালে সবুজ বাতি জ¦লে উঠলে চলতে শুরু করল গাড়ি।

ড্রাইভারকে তিনি বললেন, রাস্তার ওপাশে গিয়ে গাড়ি থামাতে।

ড্রাইভার গাড়ি থামালে তিনি রাস্তা পার হয়ে পূর্বের জায়গায় ফিরে এলেন, যেখানে ইতি দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কোথাও তিনি ইতিকে দেখতে পেলেন না। খুবই বিস্মিত হলেন তিনি। টাকা না পেয়ে ইতির উচিত ছিল তার গাড়ির পিছন পিছন আসা। অথচ আসেনি। ব্যাপারটা রহস্যজনক। তার থেকে বড় কথা মালার টাকা দিতে পারেননি। এটা মনোঃকষ্টের কারণও বটে। অবশ্য টাকা দিতে না পারার ব্যাপারটা নিয়ে অতটা চিন্তিত নন, কারণ আগামীকাল দিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ইতির এভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সত্যি বিস্ময়কর!

০৩

মাস দুয়েক পার হয়ে গেলেও ইতির আর সাক্ষাৎ পেলেন না কবির সাহেব। দিন যতই যাচ্ছে ইতিকে দেখার আগ্রহ ততই বাড়ছে তার। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ট্রাফিক সিগন্যালে এলে তিনি ভাবেন এই বুঝি ইতির দেখা পাবেন। কিন্তু দেখা আর হয় না।

ইতিকে ফুলের মালার টাকাগুলো দেয়া হয়নি। তাছাড়া কবির সাহেব ভেবে রেখেছেন ইতির সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি ইতি এবং তার পরিবারকে কিছু টাকা দেবেন যেন তারা ভালোভাবে বাঁচতে পারে। কিন্তু তার আশা পূরণ হচ্ছে না। ইতির দেখা তিনি পাচ্ছেন না। ইতিকে খুঁজতে বাসার কেয়ারটেকার হাবিবকে লাগিয়েছেন গতকাল থেকে। তার মোবাইলে ইতির যে ছবি ছিল সেই ছবি তিনি হাবিবকে দিয়েছেন।

হাবিবের পক্ষে ইতির বাসা খুঁজে পেতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। অন্য যে ছেলেমেয়েগুলো ট্রাফিক সিগন্যালে ফুল বিক্রি করে তাদের ছবিটা দেখাতেই সবাই চিনল। তারা ইতির বাসার ঠিাকানটাও বলে দিল।

দুদিন পর পড়ন্ত বিকেলে কবির সাহেব ইতির বাসার সামনে এসে উপস্থিত হলেন। বাসাটা হাজারীবাগের একটি পুরোন বাড়ি। একেবারেই জরাজীর্ণ। ভিতরের দিকে একটা কক্ষে ইতি আর তার পরিবার থাকে। দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ফর্সা চেহারার মাঝবয়সী এক মহিলা তার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, বসুন।

কবির সাহেব একা এসেছেন। হাতে একটা কেকের প্যাকেট। ইতির জন্য এনেছেন। কেকটা ধরে রেখে বললেন, এটা কী ইতিদের বাসা?

মহিলা মৃদু হেসে বলল, হ্যাঁ।

আপনি?

আ... আমি ইতির মা, আমার নাম সুরভী।

ও আচ্ছা। ইতি কোথায়?

ইতির মায়ের ম্লান হাসিটা আরও ম্লান হলো। তারপর বলল, বসুন।

কবির সাহেব চেয়ারে বসলেন।

সুরভী বলল, চা খাবেন? দুধ চা?

না। আমি ইতির জন্য কেক এনেছিলাম। ইতি কোথায়?

সুরভী কেকটা নিল। তারপর ভিতরে রেখে এসে বলল, আমি জানতাম, আপনি আসবেন।

কীভাবে জানতেন?

ইতির টানে। এজন্য আপনার জন্য চায়ের পাতা আর দুধ কিনে রেখেছি। আপনি দুধ চা খুব পছন্দ করেন।

কবির সাহেব ভ্রƒ কুঁচকে বললেন, আপনি জানলেন কীভাবে!

আপনিই আমাকে বলেছিলেন।

কবির সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আ.. আমি আপনাকে কীভাবে বলব? আমি তো আপনাকে চিনি না। আগে কখনো দেখেছি বলেও মনে করতে পারছি না।

সুরভী চায়ের পানি গরম দিল। তারপর বলল, আপনি আমাদের মতো অনেককেই দেখেন এবং ভুলে যান। কিন্তু আমরা আপনাকে ভুলি না।

কী বলছেন আপনি?

হ্যাঁ সত্য বলছি।

কবির সাহেব তাকিয়েই থাকলেন।

এবার সুরভী একটু সময় নিয়ে বলল, সময়টা কবে হবে? এখন থেকে প্রায় বারো তের বছর আগের। একদিন এক বৃষ্টির রাতে আপনি কারো সাথে সময় কাটাতে চেয়েছিলেন। তাই পথ তুলে নিয়েছিলেন কাউকে। জায়গাটা এয়ারপোর্ট রোড। নিকুঞ্জের সামনে। মনে আছে আপনার?

কবির সাহেব থমকে গেলেন। কী বলবেন কিছু বুঝতে পারছেন না।

সুরভী বলে চলল, আপনি আমাকেই সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করেছিলেন। তারপর চলে গিয়েছিলেন গাজীপুর। আপনার একদিন থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমাকে ভালো লাগায় ওখান থেকে সাতদিনের জন্য আমাকে নিয়ে কক্সবাজারে চলে গিয়েছিলেন। মনে আছে?

কবির সাহেব একেবারে চুপ হয়ে গেলেন।

সুরভী আগের মতোই বলতে থাকল, আপনি মনে হচ্ছেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। অপ্রস্তুত হওয়ার কিছু নেই। আমি কোনোদিন আপনাকে বিরক্ত করিনি, আর করবোও না। গোপনীয়তাও রক্ষা করেছি, ভবিষ্যতেও করব। সত্যি বলতে কী জানেন, আমাকে আপনার ভালো লেগেছিল সাত দিনের জন্য। আর আমার আপনাকে ভালো লেগেছিল সারা জীবনের জন্য। কারণ আমি যখনই আপনাকে আপনার পছন্দের দুধ চা বানিয়ে দিতাম, আপনি আমার খুব প্রশংসা করতেন। কেউ আগে কোনোদিন আমাকে ঐভাবে প্রশংসা করেনি। তাই ভেবেছিলাম আপনার কোনো স্মৃতি আমার কাছে রেখে দেব। রেখেও দিয়েছি।

কবির সাহেব কাঁপা কণ্ঠে বললেন, কী স্মৃতি!

সুরভী ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ইতি।

ইতি!

হ্যাঁ ইতি। আপনি চলে যাওয়ার পর আমার খুব জ্বর হয়েছিল। একটানা দুই সপ্তাহ বিছানায় পড়েছিলাম। জ্বর থেকে উঠার পর বুঝতে পারি আমার পেটে সন্তান। ঐ সন্তান যে আপনার তাতে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। আপনার প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কারণেই ওকে আমি জন্ম দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। নাম রাখি ইতি। ধীরে ধীরে বড়ও হয়ে ওঠে। একসময় জিজ্ঞেস করে আপনার কথা। আমি ওকে আপনার পরিচয় বলি। সাথে এটাও বলে দেই যে, কোনোদিন যেন ও নিজের পরিচয় দিয়ে আপনার সামনে না দাঁড়ায়। এজন্য ইতি কোনোদিন আপনাকে পরিচয় বলেনি।

কবির সাহেব কী বলবেন কিছু বুঝতে পারছেন না। তার সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপছে।

সুরভী বলতে থাকল, আসলে ও মালা বিক্রি করে যখন ফিরে আসত তখন আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে আপনার সাথে ওর কী কথা হয়েছে সেগুলো শুনতাম। অধিকাংশ দিনই আপনাদের কোনো কথা হতো না। যেদিন আপনি ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিতেন সেদিন ও খুব খুশি থাকত। আর যেদিন হাসতেন না, বড় মন খারাপ করত। শেষ যেদিন ও গিয়েছিল, আপনার নিশ্চয় মনে আছে, ও শাড়ি পরে ছিল। আপনাকে সবগুলো ফুলের মালা ও দিতে পেরেছিল। এটা ছিল ওর জন্য অনেক আনন্দের। কারণ ঐ দিন ছিল ইতির জন্মদিন। এজন্য ঐ দিন ও আপনার কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়নি। আর কোনোদিন নেবেও না।

নেবে না মানে!

সুরভী লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ও যে না ফেরার দেশে চলে গেছে। ওর ব্লাড ক্যন্সার ধরা পড়ে বছর দুয়েক আগে। আমি চেষ্টা করেছি ওকে বাঁচিয়ে রাখার। কিন্তু পারি নি। আসলে ওকে বাঁচানো আমার ক্ষমতার বাইরে ছিল। আপনার সাথে শেষ দেখা হওয়ার পর ও মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুই সপ্তাহের মাথায় আর ওকে ধরে রাখতে পারিনি। সে কী নিদারুন কষ্ট! আপনাকে বোঝাতে পারব না। আপনি বড় নিষ্ঠুর। আপনার একটা স্মৃতি আমার মাঝে রেখেছিলাম, কিন্তু আপনি তাও রাখতে দিলেন না। কেন? আমি তো আপনাকে কোনোদিন বিরক্ত করিনি? কোনোদিন কষ্ট দেই নি?

কবির সাহেব যেন একেবারে মূর্তি হয়ে গেলেন, কথা বলার মতো শক্তি তার নেই।

সুরভী শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে বলল, ইতি খুব ভালো ছবি আঁকতে পারত। সে আপনার জন্য একটি ছবি এঁকে রেখেছে। ওর ইচ্ছে ছিল সুযোগ পেলে দেবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর পেল না। আপনি অনুমতি দিলে ছবিটা আমি আপনাকে দিতে পারি।

কবির সাহেব উপরে নিচে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন।

সুরভী ঘরের মধ্যে থেকে রোল করার মতো করে ভাজ করা একটা বড় কাগজ নিয়ে এলো। কাগজটি কবির সাহেবের হাতে দিয়ে চা বানিয়ে ফেলল সে।

কবির সাহেব দু’বার চায়ে চুমুক দিলেন। এর মাঝে চশমা খুলে হাতের উলটো পিঠে চোখও মুছলেন। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে বের হয়ে এলেন। প্রচন্ড ইচ্ছে হলেও তিনি পিছনে ফিরে তাকালেন না।

০৪

এক মাস পর।

রাত তিনটা। কবির সাহেবের ঘুম আসছে না। তার ঘুম না এলে তিনি একটা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন। ছবিটা তার বেডরুমের দেয়ালে টাঙানো। ছবিতে ইতি তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে, পাশে তার মা সুরভী। তিনজনের মুখেই হাসি আর ভালোলাগার আভা। এরকম একটা ছবি আঁকা অত্যন্ত কঠিন। অথচ ইতি এঁকেছে। কীভাবে এঁকেছে কবির সাহেব জানেন না। জানতে চানও না। তিনি শুধু ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে চান। কারণ ছবিটার দিকে তাকালে তার বুক ফেটে কান্না আসে, এই কান্না বড় কষ্টের কান্না। কিন্তু কষ্টের মাঝেও কোথায় যেন ভালোলাগা আছে, শীতল শান্ত ভালোলাগা। তাই তো তিনি তাকিয়ে থাকেন, তাকিয়ে থাকেন প্রিয়, অতি প্রিয় ভালোলাগা আর ভালোবাসার ছবিটির দিকে, যে ছবিটি এঁকেছে দূরে বহুদূরে হারিয়ে যাওয়া তার একমাত্র মেয়ে ইতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :