ধারাবাহিক তাফসির পর্ব-০৭

সপ্তম তারাবির প্রথম আয়াতেই হৃদয়স্পর্শী যে ঘটনার ইঙ্গিত পাবেন

মুফতি আরিফ মাহমুদ হাবিবী
| আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ১৫:১৮ | প্রকাশিত : ১৭ মার্চ ২০২৪, ২০:২০

প্রিয় পাঠক, রহমতের সময়গুলো দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে। কোরআনকে জানার মধ্য দিয়ে আসুন সময়গুলো অতিবাহিত করি। আজ আমরা সূরা মায়িদার অবশিষ্টাংশ ও সূরা আনআমের অংশ থেকে জানবো ইনশাআল্লাহ। চলুন তাহলে কোরআনকে জানি...

আগের পর্ব: কোরআনে বর্ণিত মানবকল্যাণের বিধানাবলি

সূরা আনআম: এটি মাদানি সূরা। আয়াত সংখ্যা ১৬৫, রুকু সংখ্যা ২০। সপ্তম পারা।

সূরা আনআমের বেশ কিছু আয়াতজুড়ে মহান আল্লাহর বিভিন্ন অনুগ্রহ ও নিয়ামতের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া ঈমান ও ঈমানের মূলনীতিসমূহ এই সূরার অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

ঘটনাবলি

আজ সপ্তম তারাবির (ষষ্ঠ রমজান) প্রথম আয়াতেই একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে। মক্কা থেকে নিপীড়িত মুসলিমদের হাবশায় হিজরতের পর বাদশাহ নাজাশী ধর্মযাজকদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় পাঠান। তারা নবীজির কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুনে আপ্লুত হন। আবেগে তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়ে এবং সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। সত্য কবুলের সদিচ্ছা ও নিষ্ঠার কারণে আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। ৫/৮৩-৮৫

ইহুদীরা আল্লাহর নবী ঈসা আ.-এর নিকট অলৌকিকতার নিদর্শন হিসেবে আকাশ থেকে খাবারভর্তি খাঞ্চা (ঝুড়ি) নাযিলের দাবি করেন। মহান আল্লাহ তাদের সেই চাওয়া পূরণ করেন। তবুও তারা অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই সূরা মায়িদার নামকরণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মায়িদা মানে খাঞ্চা। ৫/১১২-১১৫

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মজলিশ ছিল সাম্যের প্রতীক। তার কাছে অসহায়, দরিদ্র ও ক্রীতদাস সাহাবিদেরও সমান গুরুত্ব এবং অবস্থান ছিল। মক্কার নেতৃস্থানীয় কাফিররা আবদার করল— ‘আমরাও নবীজির কাছে যেতে চাই, কিন্তু তার চারপাশে অবস্থান করা এইসব দরিদ্র, ক্রীতদাসদের কারণে আমরা যেতে পারি না। মুহাম্মদ সা. যদি তাদেরকে সরিয়ে দেন তবে আমরা তার মজলিশে বসতে পারি।’ কাফিরদের অবান্তর এই চাওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে মহান আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন। তিনি ধনী ও প্রভাবশালীদের মনোতুষ্টির জন্য অভাবি সাহাবিদের মজলিশ থেকে তাড়িয়ে দিতে নিষেধ করেন। সূরা আনআম(৬)/৫২

পিতা ও স্বগোত্রের প্রতিমা পূজা ও শিরক থেকে বিরত রাখতে ইবরাহিম আ. অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। প্রতিমাদের অসারতা প্রমাণে তিনি লোকদের সামনে ক্ষুরধার যুক্তি উপস্থাপন করেন। চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রের ক্ষণস্থায়িত্ব থেকে তিনি বুঝেছিলেন এগুলো ক্ষয়িষু, ধ্বংসশীল। আর যা ধ্বংসশীল তা কখনো উপাস্য হতে পারে না। এইসব যুক্তি ও প্রমাণ তিনি জাতির সামনে পেশ করেছেন। ইবরাহিম আ.-এর অসাধারণ যুক্তিনির্ভর সেই উপস্থাপনার বিবরণ রয়েছে সূরা আনআমে। ৬/৭৪-৮১

ঈমান-আকীদা

পৃথিবীর কোনো মানুষ গায়েব জানে না; এমনকি রাসূলও (সা.) গায়েব জানতেন না। বিষয়টি সূরা আনআমের দুই জায়গায় স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। ৬/৫০, ৫৯

আল্লাহ ছাড়া কারো নামে মানত করা শিরক। উৎপাদিত শস্য ও গবাদি পশু দুইভাগ করে এক অংশ আল্লাহর জন্য এবং অপর অংশ দেব-দেবীর জন্য মানত করত মক্কার মুশরিকরা। এছাড়াও কন্যা সন্তান হত্যার মতো ভয়াবহ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল তারা। আবার কিছু গবাদি পশুর গর্ভে থাকা প্রাণীকে তারা নারীদের জন্য হারাম মনে করত আর পুরুষের জন্য মনে করত হালাল। মুশরিকদের এইসব ভ্রান্ত বিশ্বাস তুলে ধরে তা খন্ডণ করা হয়েছে সূরা আনআমে। ৬/১৩৬-১৪০

পৃথিবীতে মানুষ একা এসেছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছেও মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে উপস্থিত হবে। এমনকি পার্থিব জীবনের কোনো সম্পদ বা অর্জন সেদিন মানুষের সঙ্গে থাকবে না। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াতে হবে। ৬/৯৪

প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মফল ভোগ করবে। কারো পাপের বোঝা অন্য কেউ বহন করবে না। ৬/১৬৪

এই সূরায় বর্ণিত কিছু ঐশি আদেশ

আল্লাহকে ভয় করা। ৫/৮৮

শপথ রক্ষা করা। ৫/৮৯

আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসরণ করা। ৫/৯২

সালাত আদায় করা। ৬/৭২

নেককারদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। ৬/৯০

আল্লাহর ইবাদত করা। ৬/১০২

ওহীর অনুসরণ করা। ৬/১০৬

মুশরিকদের অগ্রাহ্য করা। ৬/১০৬

প্রকাশ্য-গোপন সব ধরনের পাপ বর্জন করা। ৬/১২০

কিছু নিষেধাজ্ঞা

সীমালঙ্ঘন না করা। ৫/৮৭

আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম না করা। ৫/৮৭

ইহরাম অবস্থায় শিকার না করা। ৫/৯৫

অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন না করা। ৫/১০১

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের গালমন্দ না করা। ৬/১০৮

সংশয়গ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া। ৬/১১৪

অপচয় না করা। ৬/১৪১

শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করা। ৬/১৪২

অবিশ্বাসীদের প্রবৃত্তির অনুসরণ না করা। ৬/১৫০

বিধি-বিধান

শপথ ভঙ্গের কাফফারাহ বা ক্ষতিপূরণ হলো, ক্রীতদাসমুক্তি অথবা দশজন মিসকীনকে খাদ্য বা পোশাক দান কিংবা তিনটি রোযা। ৫/৮৯। এছাড়াও এই সূরায় ফসলের যাকাত আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৬/১৪১-১৪৪।

হালাল-হারাম

মদ, জুয়া, প্রতিমার বেদী ও জুয়ার তির হারাম। ৫/৯০, ৯১

ইহরামরত অবস্থায় সামুদ্রিক মাছ শিকার ও খাওয়া হালাল। ৫/৯৬

মৃত প্রাণী, প্রবহমান রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাইকৃত পশু ভক্ষণ হারাম। ৬/১৪৫

দৃষ্টান্ত

সূরা আনআমে মহান আল্লাহ মুমিন ও কাফিরকে জীবিত ও মৃতের সঙ্গে এবং ঈমান

ও কুফুরকে আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঈমানদার ঈমানের আলো দ্বারা পরিচালিত হয়। ফলে সে জীবন্ত মানুষের মতো। পক্ষান্তরে কাফির বিশ্বাসহীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। ফলে সে প্রাণহীন মানুষের মতো। ৬/১২২

আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন

আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালোবাসেন। ৫/৯৩

আল্লাহ যাদের পছন্দ করেন না

আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। ৫/৮৭

আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। ৬/১৪১

এক সূরায় আঠারো জন নবীর কথা

নবী-রাসূলের সংখ্যা অগণিত হলেও কুরআনে পঁচিশজন নবীর নাম আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে সূরা আনআমের চারটি আয়াতে আঠারোজন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর কোনো সূরায় একসঙ্গে এত সংখ্যক নবীর নাম উল্লেখ হয়নি। ৬/৮৩-৮৬

দুটি আয়াতে দশটি নির্দেশনা

(এক) আল্লাহর সাথে শিরক না করা। (দুই) পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা। (তিন) অভাবের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা। (চার) অশ্লীল ও মন্দ কাজের কাছেও না যাওয়া। (পাঁচ) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা। (ছয়) এতিমের সম্পদ ব্যয়ে ন্যয়ের পথ অবলম্বন করা। (সাত) ন্যায়ানুগভাবে পরিমাপ ও ওজন পরিপূর্ণ করা। (আট) কথা বলার সময় ন্যয্যতা রক্ষা করা; যদিও তা কাছের কারো বিষয়ে হয়। (নয়) আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদাগুলো পূর্ণ করা। (দশ) সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর অবিচল থাকা। ৬/১৫১, ১৫৩

সুসংবাদ ও সতর্কতা

ভালো কাজের প্রতিদান মহান আল্লাহ দশগুণ বাড়িয়ে দেন। পক্ষান্তরে প্রতিটি মন্দ কাজের বিনিময় মন্দ কাজের সংখ্যা অনুপাতে হয়ে থাকে। ৬/১৬০

শত্রুতা নিয়ে হতাশার কিছু নেই। বিশেষ করে সত্যের পথে আহ্বানকারীদের পেছনে শত্রু আরও বেশি থাকে। মহান আল্লাহ প্রত্যেক নবী-রাসূলকেই শত্রুর মুখোমুখী করেছেন। ৬/১১২

সংখ্যাধিক্য সত্যের মাপকাঠি নয়। অধিকাংশ লোকের পথ অনুসরণ করলে আপনাকে পথহারা হতে হবে। ৬/১১৬

পরকালে অস্বীকারকারীদেরকে যখন জাহান্নামের পাড়ে দাঁড় করানো হবে, তারা আক্ষেপ করে বলবে, হায় যদি দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেতাম, তাহলে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করতাম না এবং ঈমান গ্রহণ করতাম। ৬/২৭

পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া কিছু নয়। মুত্তাকীদের আখিরাতের জীবন হবে উৎকৃষ্টতর। ৬/৩২

আজকের শিক্ষা

বনী ইসরাইল ঈমান আনতে এবং আল্লাহর নির্দেশ মান্য করতে সর্বদা সংশয় ও হঠকারিতা করত। পক্ষান্তরে নাজাশীর কাছে সত্য প্রতিভাত হওয়ার পর নিঃসংকোচে তা গ্রহণ করেছেন। বনী ইসরাইলের পরিণতি এবং নাজাশীর বিনিময় উভয়টিই আমাদের জন্য শিক্ষা। ৫/৮২-৮৬

সালাত, কুরবানী, জীবন, মরণ সবকিছুই আল্লাহর উদ্দেশে নিবেদিত। এই নিবেদনকারীরাই পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করেছে ধরা হবে। ৬/১৬২

চলবে, ইনশাআল্লাহ...

লেখক: আলেম ও ওয়ায়েজ; খতীব, বায়তুল আমান জামে মসজিদ, মিরপুর-০১।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মুক্তমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :