৪০ লাখ ঘুষের লেনদেন

ডিআইজি মিজানকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকটাইমস
 | প্রকাশিত : ২১ জুলাই ২০১৯, ২২:৫০
ফাইল ছবি

চল্লিশ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

রবিবার ঢাকা সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েশ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।

এর আগে ১৬ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাস্ত পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘দুদকের বরখাস্ত পরিচালক বাছির নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। মিজান দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য বাছির ঘুষ দিয়েছেন। আর এসব করে দুজন-ই দণ্ডবিধির ১৬২/১৬৫ (ক)/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২)(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।’

ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, নথিপত্র পর্যালোচনা, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ফরেনসিক প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মিজানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গত বছরের ২৫ নভেম্বর বাছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি কাজ শুরু করেন গত বছরের ২৯ নভেম্বর।

অনুসন্ধান চলাকালে চলতি বছরের ৯ জুন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হয় যে, মিজান তার বিরুদ্ধে চলা অনুসন্ধান প্রভাবিত করতে দুদক পরিচালক বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। বিষয়টি দুদকের নজরে আসলে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে বাছিরের বক্তব্য নেয়। পরে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত বলে প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে গত ১৩ জুন বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়।

অনুসন্ধানকলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, এনটিএমসি হতে বিশেষজ্ঞ মতামত ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মিজান ১৫ জানুয়ারি একটি বাজারের ব্যাগে কিছু বইসহ ২৫ লাখ টাকা নিয়ে রমনা পার্কে যান এবং বাছিরের সঙ্গে আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে আলোচনা শেষে দু’জনই রমনা পার্ক থেকে বের হয়ে শাহজাহানপুর এলাকায় যান।

এ সময় মিজান টাকার ব্যাগটি বাছিরের হাতে দেন। এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি মিজান দ্বিতীয় দফায় ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দেওয়ার জন্য আবারও রমনা পার্কে যান। সেখানে দুজন আলোচনা শেষে পার্ক থেকে বেরিয়ে শান্তিনগর যান। সেখানে শপিং ব্যাগে নিয়ে আসা ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দিয়ে শান্তিনগর থেকে চলে যান মিজান।

এজাহারে বলা হয়েছে, বাছির ও মিজানের বিভিন্ন সময়ের কথোপকথন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাছির তার ছেলেকে ঢাকার কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা নেওয়ার জন্য মিজানের কাছে একটি গাড়ি দাবি করেছেন। গাড়ি চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বিভাগীয় তদন্ত টিমের কাছে বক্তব্যও দিয়েছেন বাছির।

এজাহারে বলা হয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংগৃহীত/প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র, এনটিএমসি’র কাছ থেকে পাওয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, মিজান ও বাছির উভয়ে বেআইনিভাবে দুটি পৃথক সিম ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওই সিম দুটি মিজানের বডিগার্ড মো. হৃদয় হাসান ও অর্ডারলি মো. সাদ্দাম হোসেনের নামে কেনা হয়।

মিজানের ভাষ্যমতে, তিনি ০১৪০১৯৪৪৯১৫ নম্বরের সিমটি ব্যবহারের জন্য বাছিরকে একটি স্যামসাং মোবাইল কিনে দেন। অনুসন্ধান কালে এনটিএমসির প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ সিমটি একটি স্যামসাং মোবাইলে ব্যবহৃত হয়েছে। যার মডেল স্যামসাং এসএম বি৩১০ই, স্যামসাং কোরিয়া, জিএসএম ৯০০, জিএসএম ১৮০০। মোবাইলটি ডিআইজি মিজানের বডিগার্ড হৃদয় হাসান বিগত ৯ জানুয়ারি বনানী সুপার মার্কেট থেকে কিনেছেন। মিজানের ভাষ্যমতে, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ সিমটি তার বডিগার্ড হৃদয় হাসানের নামে তারই নির্দেশে, তারই টাকায় কেনা হয়েছে।

অনুসন্ধানকালে আরও প্রমাণিত হয়, মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঘুষ লেনদেনের কথোপকথন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

অভিযোগ অনুসন্ধানকালে, বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য, অডিও রেকর্ডে উভয়ের কথোপকথন ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে প্রমাণিত হয় যে, নিজে অভিযোগের দায় হতে বাঁচার জন্য মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে ঘুষ দিয়ে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাছির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দুদক থেকে পাওয়া দায়িত্ব পালন করেননি। অসততার প্রমাণ দিয়েছেন। যা দণ্ডবিধির ১৬১ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

একইভাবে মিজানও সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজের বিরুদ্ধে উঠা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায় অর্থাৎ অনুসন্ধানের ফলাফল নিজের পক্ষে নেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন। যা দণ্ডবিধির ১৬৫ (ক) ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এমতাবস্থায়, বাছির ও মিজানের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫ (ক)/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করার জন্য অনুরোধ করা হলো। মিজান ও বাছির একে অপরকে প্রভাবিত করার সময়কাল : গত বছরের ২৯ অক্টোবর থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত।’

ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১৫ জুলাই কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। আর ১০ জুলাই এ বিষয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামাল হোসেনের মাধ্যমে দুদকে লিখিত বক্তব্য জমা দেন বাছির। মিজান ও বাছিরের ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান কমিটি গঠন হয় ১৩ জুন। তিন সদস্যের এ কমিটির প্রধান দুদক পরিচালক শেখ মো.ফানাফিল্যাহ। অন্য দুই সদস্য হলেন-সংস্থাটির সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাউদ্দিন।

ঢাকাটাইমস/২১জুলাই/ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

আদালত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :