আওয়ামী লীগে পুনর্বাসন কারা করছেন?

সারওয়ার-উল ইসলাম
 | প্রকাশিত : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৫৪
 
গ্রামে যারা থাকেন তারা জানেন বর্ষাকালে যখন পানি একটু একটু করে বাড়তে থাকে তখন পুকুরে ডুবিয়ে রাখা ছোট কোষা নৌকা থেকে গাছের ডালপালা সরিয়ে কিনারে এনে রাখা হয়। অনেক সময় ওই ডুবিয়ে রাখা নৌকায় মাছ পাওয়া যায়। শিং-মাগুর-বাইমসহ নানা ধরনের মাছ। তারপর সেই নৌকাটা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে কখনো আলকাতরা দেওয়া হয়। গাবের কষও সম্ভবত ব্যবহার করা হয়। 
 
একসময় বাড়ির নিচ পর্যন্ত যখন বর্ষার পানি চলে আসে তখন নৌকাটি সেখানে এনে বেঁধে রাখা হয়। কারণ পুরো বর্ষায় ওই নৌকাটি গৃহস্থের হাটবাজারে যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন। এছাড়া স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতে যেতেও ওই কোষা নৌকাটি ভরসা। 
 
পুরো বর্ষায় গ্রামের চেহারা পাল্টে যায়। ধানের খেত ডুবে যায়, দূরের ছোট সড়কটিও চার হাত পানির নিচে থাকে। সেই সময় বিকেল বেলা মানুষের বিনোদনের একমাত্র উপায় হয় বড় বড় নৌকা। বন্ধুবান্ধব মিলে বিকেলটা কাটিয়ে দেওয়া যায় দূরে কোথাও নৌকায় ঘুরে।
 
এর বাইরেও নৌকা চালায় সারা বছর ছোট খালে পেশাদার মাঝিরা। খাল দিয়ে দূরের কোনো হাটে যাওয়া থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যেতে হলে ওই মাঝিই একমাত্র ভরসা। যদিও এখন অনেক গ্রামে খাল বলে কিছু নেই। তারপরও দেশের কোনো জেলায় এখনো খালে সারা বছর নৌকা চলে। এরাই হচ্ছেন প্রকৃত মাঝি। বংশ পরম্পরায় পারিবারিকভাবে মাঝি পেশাটা ধরে রেখেছে এরা। এরা মানুষের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। কারো মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন দূরের গ্রামে। অনেক দিন যাওয়া হয় না। মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। হেঁটে হেঁটে যেতে ঘুরে ঘুরে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টার পথ। তাই পরান মাঝিকে ডেকে খাল দিয়ে মেয়েকে দেখতে যায় বাবা কিংবা মা।
 
প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। গত ২৭ আগস্ট তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘সবাইকে আওয়ামী লীগের নৌকায় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেখতে হবে কারা দুঃসময়ে দলের সঙ্গে ছিলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন। তাদেরই নেতৃত্বে রাখতে হবে, তাদের নিয়ে পথ চলতে হবে।’
 
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্যপরিষদ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী। 
 
তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আজ পরপর তিনবার ক্ষমতায়। সবাই আওয়ামী লীগের নৌকায় উঠতে চান, যারা অতীতে ও দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছেন, তারাও আওয়ামী লীগের নৌকায় উঠতে চান। সবাইকে আওয়ামী লীগের নৌকায় নেওয়ার প্রয়োজন নেই।’ 
 
তথ্যমন্ত্রীর এই আহ্বান শেষ পর্যন্ত কতটুকু টিকবে সেই জায়গায় যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ বর্তমানে যেই রাজনীতি সারা দেশে শুরু হয়েছে সেই প্রেক্ষাপটে তথ্যমন্ত্রীর এই বাণী পাঠ্যবইয়ের মতো। পাঠ্যবইয়ের পাতায় মানায়, বাস্তবে টেকার মতো না।
 
যার চৌদ্দগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে কুৎসা রটিয়ে বেরিয়েছে সারা জীবন, শোনা যায় এমন লোকদের জেলা উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কমিটিতে রাখা হচ্ছে। 
 
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, অনেকেই আজকাল রসিকতা করেই বলে দেশে এখন বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টি নেই। সবাই আওয়ামী লীগ। নিতান্তই মজা করে কথাটা বললেও এর পেছনের কারণটা খোদ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা অনুধাবন করতে চায় না, ইচ্ছে করেই। কারণ সত্যিকার অর্থেই এখন সবাই আওয়ামী লীগ। যাদেরকে দেখা যেত একসময় দূরে দূরে থাকতো আওয়ামী লীগের কোনো সভা-সেমিনার হলে, তারা এখন ঘুরঘুর করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে।
 
আর একবার যদি বিএনপি বা জামায়াতের খোলসটা খুলে কেউ আওয়ামী লীগের লেবাস গায়ে চড়াতে পারে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা হলে তো কথাই নেই। ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সিগারেটের ধোঁয়াটা পারলে তাদের মুখের সামনেই যেন ছাড়তে চায়। এই হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে পড়া পুনর্বাসিত আওয়ামী বিরোধীদের অবস্থা।
 
এখন কারা এই পুনর্বাসনের সঙ্গে জড়িত? সেই দিকটা তথ্যমন্ত্রী সাহেবের খুঁজে বের করা দরকার। কারা কত টাকার বিনিময়ে এদেরকে দলে ঢুকিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় আওয়ামী লীগকে কলুষিত করছে। এরা যে আওয়ামী লীগকে ডোবানোর মিশন নিয়ে আওয়ামী লীগে ঢুকেছে তাও অনুধাবন করার জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের দৃষ্টি ফেরানো দরকার।
 
এবার তথ্যমন্ত্রীর আহ্বানের অন্য দিকটি ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেছেন, সবাইকে আওয়ামী লীগের নৌকায় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। যারা দুঃসময়ে ছিলেন কেবল তাদেরকে উঠানোর কথা উনি বলেছেন। কিন্তু কেন শুধু নৌকায়? যারা দুঃসময়ে ছিলেন না তাদেরকে তো দলেই রাখা দরকার নেই। নাকি বিষয়টা এমন যে দলে থাকুক। নৌকায় নেব না। দলে থেকে যে দলের বারোটা বাজাবে এরা, সেটা ভেবে দেখেছেন তথ্যমন্ত্রী সাহেব? 
অবশ্য আজকাল এমনও অনেক কথা শোনা যায়, কেউ যদি নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অন্যদল ছেড়ে আওয়ামী লীগে আসে তাতে ক্ষতি কি? এই ধরনের ধারণাও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের লোকদের কেউ কেউ দিয়েছেন। যারা কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে
বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে আওয়ামী লীগে ঢোকানোর ঠিকাদারি নিয়েছেন। 
 
আমরা চাই আওয়ামী লীগে প্রকৃত আওয়ামী লীগাররাই থাকুক। তাই বলে নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আসবে না? অবশ্যই আসবে। তার আগে দেখা দরকার তাদের পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক পরিচয় বা মানুষ হিসেবে তারা কেমন ছিলেন। তা না দলে বানের পানির মতো আওয়ামী লীগে এখন যেমন ভর্তি হতে শুরু করেছে তাতে আরেকটা ১৫ আগস্ট যে আসবে না, তা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। 
শুধু বর্ষার টলটলা পানি দেখে নৌকায় চড়ার শখ থাকুক বিনোদনপ্রিয় মানুষের জন্য। আর সেই পরান মাঝির নৌকায় যারা সারা বছর চলাচল করেন তারাই জানেন কত যুগ ধরে ঐতিহ্যবাহী নৌকাকে পরান মাঝিরা পেশা হিসেবে ধরে রেখেছে। তাদেরকে লাল সালাম।
 
 
 
 
 
 
 
 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :