শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান:ফ্যান্টাসি থ্রিলার সিরিজ,পর্ব-নয়

ড. রাজুব ভৌমিক
 | প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ২৩:২০

এভাবে মহারাজ মঞ্জটের ছয় সন্তান জন্ম হবার কয়েকমাসের মধ্যে মারা যায়। মহারাজা মঞ্জট কয়েকবছরের মধ্য ছয়টি সন্তান হারিয়ে সন্তানশোকে দিশাহারা। মহারাজ মঞ্জট তখন দেবতা কিতমুকে স্মরণ করে। কিছুক্ষণের মধ্যে পাপের দেবতা কিতমু এসে মঞ্জটের সামনে হাজির। ‘হে প্রভু, আমি সন্তান শোকে কাতর। আমাকে সাহয্য করুন। মহারাণী সুনীতি গত কয়েক বছরে ছয়-ছয়টি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে কিন্তু প্রত্যেকে বার তারা জন্ম হবার কয়েকমাসের মধ্যে মারা গেছে। এমন কেন হচ্ছে, প্রভু? আমি যে আর সহিতে পারছি না, প্রভু!’ মহারাজ মঞ্জট দেবতা কিতমুকে হাতজোড় করে বলল। ‘এ সবকিছু তোর কৃতকর্মের ফসল মঞ্জট! তোর কি মনে আছে তুই আমার কাছে কোন দুইটি বর চেয়েছিলে?’ দেবতা কিতমু বলল। ‘মনে আছে প্রভু। একবরে, আমার মহাপাপের ভাগীদার শুধু আপনি হবেন এবং আরেকবরে, আপনাকে সন্তান হিসেবে আমি সাত-জন্মে পাব।’ মঞ্জট কাঁদতে কাঁদতে বলল। ‘ঠিক বলেছ! তোর প্রথম বর অনুযায়ী আমি তোর মহাপাপের ভাগীদার হয়েছি- তোর দ্বিতীয় বর অনুযায়ী তোর সন্তান হিসেবে জন্ম নিচ্ছি। তুই তোর আপন ভাই নিম্বকে ছলনা করে হত্যা করেছিলে। ভাই হত্যা মহাপাপ। এই মহাপাপ থেকে একজন শুধু সাতবার প্রাণ বিসর্জন করে মুক্তি পেতে পারে। এই পর্যন্ত আমি তোর সন্তান হিসেবে ছয়বার জন্ম নিয়েছি এবং প্রত্যেকবার তোর সে মহাপাপের বোঝা নিতে গিয়ে আমার মৃত্যু হয়েছে। আমি তোর ঘরে আরেকবার জন্ম নিব এবং পুনরায় মৃত্যুবরণ করে তোর মহাপাপ থেকে উদ্ধার হব। এতে তোকে দেয়া আমার প্রথম ও শেষ বর সম্পূর্ণ হবে মঞ্জট!’ 

দেবতা কিতমুর কথা শুনে মহারাজ মঞ্জটের মাথায় যেন বাজ পড়ে। মঞ্জট হাউমাউ করে দেবতা কিতমুর পায়ে পড়ল। ‘প্রভু আমায় ক্ষমা করুণ! আমায় এত শাস্তি দয়া করে দিবেন না। আপনার মহিমা আমি এতদিন বুঝতে পারিনি। আমাকে সন্তান হারা করবেন না প্রভু-আমার বংশ রক্ষা করুন।’ দেবতা কিতমু বলল, ‘আছে, একটি উপায় আছে।’ মহারাজা মঞ্জট উঠে দাঁড়ায়, ‘প্রভু বলুন সেই কোন উপায়। আমি আমার বংশ রক্ষা করার জন্য যে কোন কিছু করতে রাজি আছি।’ দেবতা কিতমু তখন বলল, ‘তোর বংশ রক্ষা হবে দুইটি শর্তে: যদি তোর পরবর্তী সন্তান বা শেষ সন্তান শত্রুর ঘরে লালন-পালন হয়ে বড় হয় এবং তুই তোর সন্তানের চেহারা তোর মৃত্যু পর্যন্ত যদি না দেখিস। মহারাজ মঞ্জট! যদি কখনো তুই তোর সন্তানের মুখ দেখিস তাহলে তোর সেদিনই মৃত্যু হবে! এটাই হবে তোর শাস্তি এবং বংশ রক্ষার উপায়।’ তখন মহারাজ মঞ্জট দেবতা কিতমুকে বলল, ‘প্রভু আমার কোন শত্রুর ঘরে আমার সন্তান বেড়ে উঠবে? আমাকে একটু দয়া করে বলুন।’ দেবতা কিতমু বলল, ‘চলদাজ রাজ্যে তোর সন্তান যুবরাজ শিহিলের ঘরে বেড়ে উঠবে। তার স্ত্রী পিয়া গর্ভবতী। পিয়া আমার একজন প্রিয় ভক্ত। তোর সন্তান এবং পিয়ার সন্তান একই দিন জন্ম নিবে। পিয়া একটি মৃত সন্তান প্রসব করবে। তোর সন্তানকে তার কোলে তুলে দিতে হবে।’এই বলে দেবতা কিতমু অদৃশ্য হয়ে চলে যায়। 

মহারাজা মঞ্জট মহারাণী সুনীতিকে এ সম্পর্কে কিছু জানায় নি। মহারাজা তার সেনাপতির মাধ্যমে লাগগিন্তা রাজ্যের বিশ্বস্ত একজন গুপ্তচরকে ডেকে পাঠায়। গুপ্তচরের নাম হচ্ছে সুনেন্দ। সারা লাগগিন্তা রাজ্যে সুনেন্দের বহু সুনাম আছে। তার বীরত্ব নিয়ে বহু-গল্প আছে যা মায়েরা তাদের সন্তানকে শোনায়। সুনেন্দের বীরত্ব নিয়ে কবিরা বহু কবিতাও লিখছে। গুপ্তচর সুনেন্দের বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, এবং সাহসের কারণে লাগগিন্তা রাজ্য কয়েকবার শত্রু-মুক্ত হয়। সে মহারাজা শশাঙ্ক এবং তখনকার যুবরাজ মঞ্জটকে কয়েকবার গোপন তথ্য দিয়ে শত্রুরহাতে নির্ঘাত মৃত্যু থেকে বাঁচায়। সুনেন্দকে কেউ কখনো চোখে দেখেনি। সে মহারাজ শশাঙ্কের একজন বিশ্বস্ত গুপ্তচর ছিল। মহারাজ মঞ্জট যখন যুবরাজ ছিল তখন সে মহারাজ শশাঙ্কের কাছ থেকে সুনেন্দের নামে বহু সাহসিকতার গল্প শুনেছে কিন্তু মহারাজা মঞ্জট কোন দিন সুনেন্দকে সামনা-সামনি দেখেনি। ছোট-বেলায় গুপ্তচর সুনেন্দকে যুবরাজ মঞ্জটের দেখার খুব ইচ্ছে ছিল কিন্তু মহারাজ শশাঙ্ক তা সম্ভব হতে দেয়নি। আজ মহারাজ মঞ্জট সুনেন্দের গভীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তাই তাকে সে ডেকে পাঠায়। 

মহারাজা মঞ্জট বিকেল বেলায় রাজ প্রাসাদের রাজকোষে হিসাব-নিকাশ করতে আসল। হঠাৎ রাজকোষের ভিতর কেউ একজন বলল, ‘মহারাজ, আপনি আমাকে ডেকেছেন?’ মহারাজা মঞ্জট রেগে আগুন এবং বলল, ‘কে তুমি? তুমি কিভাবে এখানে প্রবেশ করলে? এই কক্ষটি লাগগিন্তা রাজ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত একটি কক্ষ।’ গুপ্তচর সুনেন্দ বলল, ‘মহারাজ, আমি লাগগিন্তা রাজ্যের একজন সেবক এবং গুপ্তচর সুনেন্দ। আমার প্রণাম নিন।’ মহারাজ মঞ্জট সুনেন্দের আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘সত্যিই তুমি আসলে মহান। পূর্বে তোমার বহু গল্প শুনেছি। আজ তোমাকে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম।’ গুপ্তচর সুনেন্দ মহারাজের পায়ে ধরে প্রণাম করে। ‘তোমাকে একটি গুরুত্ব পূর্ণ দায়িত্ব দিব বলে ডেকে পাঠালাম। আজ থেকে তোমার একটি দায়িত্ব হবে আর সেটি হচ্ছে লাগগিন্তা রাজ্যের ভবিষ্যত রক্ষা করা।’ মহারাজ বলল। ‘মহারাজ, দয়া করে খুলে বলুন।’ সুনেন্দ বলল। মহারাজা মঞ্জট তখন সুনেন্দকে বলল যে, কয়েক মাসের মধ্যে তার সন্তান জন্ম নিবে-সে সন্তান জন্ম নেবার পর তার সমস্ত দায়িত্ব সুনেন্দকে নিতে হবে। মহারাজ মঞ্জট আরো বলেন, ‘চলদাজ রাজ্যের মহারাজ রাসঙ্কের পুত্র যুবরাজ শিহিলের স্ত্রী পিয়া গর্ভবতী। আমার সন্তান জন্ম নেবার পরপরই তোমাকে আমার সন্তান চুরি করে নিয়ে যেতে হবে। এরপর আমার সন্তানকে পিয়ার কোলে দিয়ে তার মৃত সন্তানকে তোমাকে মহারাণী সুনীতির কোলে রেখে দিতে হবে। আর শোন, এই কথা যেন তুমি আর আমি ছাড়া চন্দ্রগ্রহের কেউ যেন না জানে! মহারাণী সুনীতিও যেন না জানে।’ এরপর সুনেন্দ বলল, ‘মহারাজ আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করব।’ মহারাজ মঞ্জট সুনেন্দের কথা শুনে আশ্বস্ত হয়। ‘আরেকটি আদেশ দিচ্ছি তোমাকে-তুমি চলদাজ রাজ্যে সবসময় আমার সন্তানের ছায়া হয়ে থাকবে। আমি যেন কোন দিন আমার সন্তানের মুখ যেন না দেখতে পারি। আমি আমার সন্তানের মুখ দেখলে অনেক বড় অঘটন ঘটে যেতে পারে।’ মহারাজ মঞ্জট গুপ্তচর সুনেন্দকে দেবতা কিতমু অভিশাপের কথা না বলে এ আদেশ দেয়। গুপ্তচর সুনেন্দ কিছু বুঝতে পারছে না কেন মহারাজ তাকে এমন আদেশ দিচ্ছে কিন্তু সে কোন কিছু না জিজ্ঞেস করে বলল, ‘মহারাজ, আপনার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।’ এরপর সুনেন্দ চলে যায়। 

মহারাজা মঞ্জটের মনটি তেমন ভাল নাই। রাজকর্মে তার কোন মনোযোগ নেই। একদিন মহারাজা মঞ্জট রাজপ্রাসাদের সামনে একটি গাছের নিচে বসে কি যেন ভাবছে। তখন এক রাজ-প্রহরী এসে বলল, ‘মহারাজ, সুসংবাদ! রাজবৈদ্য বলেছে মহারাণী সুনীতি এখন গর্ভবতী।’ মহারাজা মঞ্জট এ খবর শুনে প্রচন্ড খুশি হয়। কিন্তু পরক্ষনে মঞ্জটের দেবতা কিতমুর অভিশাপের কথা মনে পড়ে যায়। মহারাজ মঞ্জটের মন আবার খারাপ হয়ে যায়।

এদিকে চলদাজ রাজ্যের মহারাজার রাসঙ্কের বর্তমানে উনত্রিশ জন পুত্রের মধ্যে জেষ্ঠ্য পুত্র যুবরাজ শিহিল। লাগগিন্তা রাজ্যের সাথে যুদ্ধে হারিয়ে চলদাজ রাজ্য এখন বিপর্যস্ত। যুদ্ধে চলদাজ রাজ্যের বেশিরভাগ সেনা মারা যায়। লাগগিন্তা রাজ্যের সাথে যুদ্ধে একমাত্র কন্যা তিস্রা এবং এগারজন যুবরাজকে হারিয়ে মহারাজ রাসঙ্ক এখন সন্তানশোকে শয্যাশায়ী। তাই যুবরাজ শিহিল চলদাজ রাজ্য পুন:গঠনে ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে। যুবরাজ শিহিল তার রাজ্যের সেনাক্যাম্পে সেনা-নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণ নিজ হাতে পরিচালনা করছে। চলদাজ রাজ্যের সেনারা যুবরাজ শিহিলকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করে। যুবরাজ শিহিল নিজেওএকজন ভাল যোদ্ধা এবং তার সেনাদের ভাল যোদ্ধায় পরিণত করতে সে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। যুবরাজ শিহিল সেনাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তখন চলদাজ রাজ্যের মন্ত্রী কাগবি এসে হাজির। মন্ত্রী কাগবি যুবরাজ শিহিলকে তার স্ত্রী পিয়ার সাত মাসের সন্তানসম্ভাবা খবরটি জানায়। যুবরাজ শিহিল সে খুশিতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। কিন্তু সে মন্ত্রীর সাথে রাজপ্রাসাদে যেতে চায়নি। যুবরাজ শিহিল মন্ত্রী কাগবিকে বলল, ‘আমি এই নতুন সেনাদের ছেড়ে এখন যেতে পারি না। এরা সবাই আমার সন্তানের মত। তাছাড়া আমি না থাকলে সেনাদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে।’ তবে যুবরাজ শিহিল মন্ত্রী কাগবিকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আমি শীঘ্রই রাজপ্রাসাদে আসছি। কিন্তু এর আগে আমাকে যথেষ্ট সেনা নিয়োগ করতে হবে এবং লাগগিন্তা রাজ্যের উপর প্রতিশোধের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে!

এভাবে তিন মাস চলে যায়। রাক্ষস বংশের মেয়েরা গর্ভবতী হবার পর তিনমাসের মধ্যে সন্তান প্রসব করে যেখানে শশীকন্যাদের প্রায় এক বছর সময় লাগে। মহারাণী সুনীতি যেহেতু রাক্ষস বংশের তাই তার যে কোন দিন সন্তান প্রসব হতে পারে। মহারাজা মঞ্জট এটা জানতে পেরে সে একটি অজুহাতে লাগগিন্তা রাজ্যে বহুদূরে একটি অঙ্গরাজ্যে চলে যায়। মহারাজ মঞ্জট চাইছে না যে সে কোনভাবে তার যেন সে সন্তানের মুখ দেখতে না পায়। কারণ তার সন্তানের মুখ দেখতে পেলে দেবতা কিতমুর অভিশাপ অনুযায়ী তার মৃত্যু হবে। মৃত্যুভয়ে তাই মহারাজা মঞ্জট লাগগিন্তা রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। 

মহারাজ মঞ্জটে চলে যাবার তিনদিন পর সুনীতির প্রসবব্যাথা উঠে। গুপ্তচর সুনেন্দ রাজপ্রাসাদে দাই-এর বেশ ধরে মহারাণী সুনীতির পাশে আছে। গভীররাতে মহারাণী সুনীতি একটি ছেলে সন্তান প্রসব করে। দেবতা কিতমু তার দেয়া বর হিসেবে মঞ্জটের ঘরে সপ্তম বারের মত জন্ম নেয়। গুপ্তচর সুনেন্দ মহারাজ মঞ্জটের দেয়া আদেশ অনুযায়ী মহারাণী সুনীতির কোল থেকে তার ছেলে সন্তানটি নিয়ে যায়। মহারাণী সুনীতি দেবতা কিতমুর দৈব্য ক্ষমতাবলে গভীর ঘুমে আছন্ন হয়ে পড়ে আছে। এদিকে গুপ্তচর সুনেন্দ সুনীতির সদ্য জন্ম নেয়া ছেলেকে গভীররাতে চলদাজ রাজ্যে নিয়ে যায়। যুবরাজ শিহিলের স্ত্রী পিয়া প্রসব বেদনায় অস্থির। কিছুক্ষণ পর পিয়া একটি মৃত ছেলে সন্তান প্রসব করে। গুপ্তচর সুনেন্দ চলদাজ রাজ্যের রাজপ্রাসাদে সুনীতির ছেলে নিয়ে প্রবেশ করে। পিয়ার দাই একটি মৃত ছেলে সন্তান দেখে খবর দিতে মহারাজা রাসঙ্ক ও মহারাণী যোদির কক্ষে যায়। এই সুযোগে গুপ্তচর সুনেন্দ সুনীতির ছেলেকে পিয়া পাশে রেখে তার মৃত সন্তান নিয়ে চলে যায়। মহারাজা রাসঙ্ক ও মহারাণী যোদি দাই-এর সাথে পিয়ার কক্ষে প্রবেশ করে। তারা দেখতে পায় পিয়ার ছেলে কান্না করছে। দাই অবাক হয়ে যায়। সে মহারাজার কাছে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চায়। 

অন্যদিকে মহারাণী সুনীতি ঘরে গুপ্তচর সুনেন্দ পিয়ার মৃত ছেলে রেখে চলে যায়। সুনীতি ঘুম থেকে জেগে উঠে তার মৃত সন্তানকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। মৃত সন্তান প্রসবের খবর মহারাজা মঞ্জটের কাছে পৌঁছে যায়। মহারাজ মঞ্জট সব বুঝতে পারে। পরেরদিন সে লাগগিন্তা রাজ্যের রাজপ্রাসাদে পৌঁছে যায়। সে মহারাণী সুনীতিকে সান্তনা দেয়। 

চলদাজ রাজ্যে এখন খুশির বন্যা বইছে। মহারাজা রাসঙ্ক আদর করে পিয়ার ছেলের নাম ‘তৃষ’ রাখে। প্রায় একমাস পর যুবরাজ শিহিল সেনা ক্যাম্প থেকে চলদাজ রাজ্যের রাজপ্রাসাদের তার ছেলে তৃষ কে দেখতে আসে। তৃষ কে দেখে যুবরাজ শিহিলের আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। মহারাজ রাসঙ্ক এখন অনেকটাই সুস্থ-কিন্তু এখনো সে রাজকর্ম আরম্ভ করেনি। মন্ত্রী কাগবি সব সামলে নিচ্ছে। যুবরাজ শিহিল মহারাজ রাসঙ্কের কক্ষে আসে এবং তাকে চলদাজ রাজ্যের সেনা-নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের সব খবর দেয়। ‘পিতাশ্রী, আপনি জেনে খুশি হবেন যে এরই মধ্যে প্রায় চল্লিশ হাজার নতুন-সেনা যোগ দিয়েছে। তাদের সবার এখন প্রশিক্ষণ চলছে। এদের কেউই সেনার বেতন চায় না। এদের সবার একটাই উদ্দেশ্য’ আর সেটি হচ্ছে লাগগিন্তা রাজ্যে আক্রমণ করে রাজকন্যা তিস্রা, এগারজন যুবরাজ ও আশি-হাজার চলদাজ সেনাবধের প্রতিশোধ নেয়া। পিতাশ্রী, দিন দিন হাজার হাজার চলদাজ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ প্রজারা আমাদের সেনা ক্যাম্পে যোগ দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের এক লক্ষ সেনা হয়ে যাবে।’ যুবরাজ শিহিল বলল। যুবরাজ শিহিলের কথা শুনে মহারাজ রাসঙ্ক আশ্বস্ত হয়। কিছুক্ষণ পর মহারাজ রাসঙ্ক বলল, ‘লাগগিন্তা রাজ্যের প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক সেনা মঞ্জটের অধীনে আছে। আবার দশজন বিশেষ আজ্রিয়া সেনা আছে যাদের প্রত্যেকের রয়েছে একহাজার হাতির শক্তি। আমাদের একলক্ষ সেনা দিয়ে এত বিশাল শক্তির কাছে আমরা কি করতে পারি। লাগগিন্তা রাজ্যের সাথে আবার যুদ্ধ করলে গতবারের মত আমাদের নির্ঘাত পরাজয় হবে।’ যুবরাজ শিহিল বলল, ‘পিতাশ্রী সৈন্য সংখ্যা মুখ্য নয় কিন্তু সেনাদের কর্তব্য-বোধ ও নিষ্ঠা হচ্ছে আসল। আপনি চিন্তা করবেন না। লাগগিন্তা রাজ্যের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় হবেই।’ যুবরাজ শিহিল পরেরদিন সেনাক্যাম্পের উদ্দেশে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যায়। 

এদিকে দেবী আজ্রিয়ার পুত্র কিবন গুরুগৃহে তার পাঠশালা সম্পুর্ন করে পিতার খোঁজে নিম্ব দ্বীপ বা প্রেমের দ্বীপ থেকে লাগগিন্তা রাজ্যের উদ্দেশ্য চলে যায়। দেবী আজ্রিয়া তার স্বামী লাগগিন্তা রাজ্যের যুবরাজ নিম্ব হত্যা হবার পর লাগগিন্তা রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। তখন দেবী আজ্রিয়া লাগগিন্তা রাজ্য থেকে বহুদূর এক শশী-শূন্য দ্বীপে নামে। সে দ্বীপে দেবী তার দৈব ক্ষমতা-বলে যুবরাজ নিম্বের শেষ ক্রিয়া সম্পন্ন করে। যুবরাজের দেহ যেন সবসময় দেবী আজ্রিয়ার প্রেমে ডুবে থাকে সে জন্য দেবী তার ভালবাসা দিয়ে তার চিতার উপরে বিশাল এক সমাধি গড়ে তুলে। এ সমাধিটি এত বিশাল যে দেখতে একটি ছোট পাহাড়ের মত। পরবর্তী তে এ দ্বীপ নিম্ব দ্বীপ বা প্রেমের দ্বীপ নামে পরিচিত হয়। নিম্ব দ্বীপে দেবী আজ্রিয়া একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। দেবী আজ্রিয়ার পুত্র কিবন সবসময় তার মাকে তার পিতার কথা জিজ্ঞেস করত কিন্তু দেবী আজ্রিয়া তাকে কিছু বলেনি। যুবক কিবন অন্যদের মুখে জানতে পায় যে লাগগিন্তা রাজ্যের যুবরাজ নিম্ব তার পিতা এবং সে বহুকাল আগে মারা গেছে। যুবরাজ নিম্ব তার গুরুগৃহে শিক্ষা সম্পন্ন করে ঠিক করে সে তার পিতাকে নিয়ে সব রহস্য উদ্ঘাটন করবে। 

পথে অন্যদের কাছ থেকে যুবক কিবন জানতে পায় যে আজ্রিয়া যুদ্ধ ও বিচারের দেবী এবং সে দেবরাজ কৃতনু এবং মহাদেবী উষার নাতি। যুবক কিবন আরো জানতে পায় যে সে লাগগিন্তা রাজ্যের একসময়ের মহারাজা শশাঙ্ক এবং মহারাণী কুর্নষার নাতি। কিন্তু সে জানতে পারে না যে কিভাবে তার পিতা মারা গেছে। দেবী আজ্রিয়ার পুত্র কিবনের মধ্যে শশীদের গুণ এবং দেবতাদের গুণ দুই বিদ্যমান। পুরো সূর্যগ্রহ এবং চন্দ্রগ্রহে কিবনই একমাত্র যার মধ্যে দেবতাদের গুণাবলী এবং শশীদের গুণাবলী দুই রয়েছে। যুবক কিবন অনেক ভাল একজন যোদ্ধা, যার কাছে বহু বলবান যোদ্ধা হার মানতে হয়েছে। কথিত আছে যুবক কিবনের গায়ে বিশ হাজার হাতির জোর। অনেক রাজ্য ভ্রমণ করে কিবন চলদাজ রাজ্যে এসে পৌঁছে। 

চলবে...

লেখক: কবি ও লেখক, অধ্যাপক: অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগ, জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউইর্য়ক, মনস্তাত্তিক বিভাগ, হসটস কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি, নিউইর্য়ক। কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা, নিউইর্য়ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :