দেশের কর্মক্ষেত্র উপযোগী শিক্ষা জরুরি

শেখ সাইফ
| আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৭ | প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৪৪

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গাবতলী আন্তজেলা বাস টারমিনালের পাশে সুবিশাল ক্যাম্পাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি। সাড়ে পাঁচ লাখ বর্গফুটের এই ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করছেন প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রশস্ত ও খোলামেলা ভবনের সব তলাতে রয়েছে চলমান সিঁড়ি ও উন্নত লিফট ব্যবস্থা। কর্তৃপক্ষ বলছে, গরিব শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে কম খরচে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সাত বছরে সর্বাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছেন তারা।

দেশের অন্যতম বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপাচার্য প্রফেসর ড. মকবুল আহমেদ খান। একাধারে নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ডের ব্রাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর ড. মকবুল আহমেদ খান ১৯৭৬ সালে মস্কো টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৬ বছর বিশ্বব্যাংকের টেক্সটাইল অ্যাডভাইজার হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজ করেন তিনি। বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতকে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে নিয়ে গেছেন। উচ্চশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তিনি এবং ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ২০১২ সালে গড়ে তোলেন ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাসহ  নানা দিক নিয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রফেসর ড. মকবুল আহমেদ খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ সাইফ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ভাবনার পেছনের গল্পটা বলুন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ধারণাটা আমার অনেক আগে থেকে মাথায় এসেছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষাব্রতী মানুষ। শিক্ষাপ্রচারে নিবেদিতপ্রাণ। আমার শিক্ষকতার জীবন শুরু হয়েছে বিদেশে; ইংল্যান্ড, রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে। আমার লেখাপড়া, নেশা ও পেশা টেক্সটাইলের ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লানিং এবং এই বিষয়েই আমি পিএইচডি করি। ১৯৮৪-৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা তৈরি পোশাকের ওপর থেকে ‘ডিউটি-ফ্রি এক্সেস’-এর সুবিধা প্রত্যাহার করে। ফলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প চরম সংকটের সম্মুখীন হয়। এর কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ৫৪টি টেক্সটাইল মিলের পুনর্বাসনের জন্য Textile Industry Rehabilitation Project (TIRP) প্রকল্পে ২.০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার চুক্তি করে। উদ্দেশ্য ছিল এসব পুনর্বাসিত টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত উন্নত বস্ত্র দেশের ক্রমসম্প্রসারণশীল রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে সরবরাহ করে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি। ঠিক এর পরপরই বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী টেক্সটাইল পণ্যের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের ওপর মরণ-কামড়ের মতো আঘাত হানে। বিশ্বব্যাংকও তার পরিকল্পিত পুনর্বাসন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় পড়ে যায়।  ঠিক এই সময় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প তথা টেক্সটাইল শিল্পকে সংকটমুক্ত করার জন্য বিশ্বব্যাংক আমাকে টেক্সটাইল অ্যাডভাইজর হিসাবে নিয়োগ দেয়। ১৯৮৫ সালের জুন মাসে আমি বিশ্বব্যাংকে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে সময়োপযোগী নীতিমালা ও কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখি।

১৯৮৪-৮৫ সালের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলার থেকে  ২০০০ সালে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করায় আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি। এই কাজটা করতে করতে আমার মনে হতে থাকে আমি তো একজন শিক্ষক। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রচারেও আমার কিছু করা দরকার। আমার দেশের মোট জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ গ্রামে শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু স্কুল-কলেজের পর আর বেশিদূর এগোতে পারছে না।

আমি দেখলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিশাল এক শূন্যতা রয়েছে। সারাদেশে বছরে এইচএসসি লেভেলে পাস করে ১১ লাখের অধিক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে মাত্র ৪০-৫০ হাজার শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন কলেজে মিলিয়ে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে। তাহলে মোট দেড় লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুমানিক তিন লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে। সর্বমোট সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিতে পারছে। অবশিষ্ট সাড়ে ছয় লাখ শিক্ষার্থী যাবে কোথায়? এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অধিকাংশ গ্রামের।

গ্রামের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো না হওয়ার পেছনে কারণ রয়েছে। গ্রামের স্কুল-কলেজে শিক্ষকরাও তেমন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না। আবার গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা আর্থিক অনটনের কারণে বইপত্র জোগাড় করতে পারে না এবং পড়াশোনায় ষোল আনা মনোযোগ দিতে পারে না। কোচিং তো গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য স্বপ্ন। ফলে এসএসসি পরীক্ষায় তাদের জিপিএ সন্তোষজনক হয় না; যদিও মেধার দিক দিয়ে তারা শহরাঞ্চলের বিত্তবান শিক্ষার্থীদের চেয়ে একটুও কম না। আর এই খারাপ ফলাফলের জন্য ভর্তি হতে পারে না সরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি ভর্তির জন্য আবেদনও করতে পারে না। আমি মূলত ওই শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করি। ওই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মূল সমস্যা হলো দারিদ্র্য। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নাই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েশন করতে ১০-২০ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এত টাকা তারা কোথা থেকে জোগাড় করবে! এই সমস্য সমাধানের লক্ষ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিতে সমমানের গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রামের খরচ দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে সীমিত রেখে তাদের পড়াশোনা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছি।

এক্ষেত্রেও কথা আছে। যদি একান্তই এই টাকা জোগাড় করতে না পারে কেউ, সেক্ষেত্রেও আমরা পড়াশোনা চালিয়ে যাবার সুযোগ করে রেখেছি। আমরা সেই সুযোগের নাম দিয়েছি ইটেপ প্রোগ্রাম (Education through Employment Programme)।

গ্রামীণ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় করলেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রটা গুরুত্ব দেওয়ার অনুপ্রেরণা কী?

আসলে আমার শুরুর মূল অনুপ্রেরণা ছিল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের, যাদের মেধা আছে, তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা। আমি নীতিগতভাবে বিশ্বাস করি আমাদের দেশে এই শিক্ষার্থীদের এমন সব বিষয়ে পড়াশোনা করা উচিত যা দেশের কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত। যাতে করে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বিষয়ের ওপর চাকরি করতে পারবে।

এজন্য আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষার বিষয় হলো প্রকৌশলবিদ্যা বা ইঞ্জিনিয়ারিং; ১০ শতাংশ ব্যবসায় প্রশাসন শিক্ষা, অবশিষ্ট মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী আইন, ইংরেজি ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করে। কারণ আমি জানি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলো শুরু করা খুব কঠিন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরি স্থাপনসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করে ইউজিসির কাছে যেতে হয় অনুমতির জন্য। একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের জন্য বিপুল অর্থব্যয়ে ল্যাব তৈরি করে আড়াই বছর বসে আছি। ইউজিসি এখনো অনুমতি দেয়নি। শিক্ষক নিয়োগ দিয়েও রেখেছি। তাদের নিয়মিত বেতনও দিয়ে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে আমি যদি মানবিক শাখার কোনো বিষয় খুলতাম তাহলে আমার কিছুই লাগত না। ইউজিসি অনুমোদন না দিলে প্রোগ্রাম পরিত্যাগ করা সহজ। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি প্রোগ্রামের জন্য ইউজিসিতে আবেদনের আগেই কোটি টাকার ৮-১০টা ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হয়; তারপর যদি সেই প্রোগ্রাম অনুমোদন না পায় তাহলে পুরো বিনিয়োগ নষ্ট হয়।

আমি বিশ্বাস করি শিক্ষা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মনে করি এদেশের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছুটা অবদান রাখতে পারি তাহলে আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির অনুমোদিত সর্বনিম্ন জিপিএ-২.৫ এর কম পেলে ভর্তি করা হয় না। আমি বিশ্বাস করি নগরের কোনো স্কুল বা কলেজে যদি তারা পড়াশোনার সুযোগ পেত তাহলে এদের অনেকেই জিপিএ ৪-৫ পেত। তারা যদি কোচিং করত তাহলে তাদের গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া ছিল সহজসাধ্য ব্যাপার।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কোন বিষয়গুলো পড়াশোনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে?
প্রধানত এখানে প্রকৌশলবিদ্যা বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর মধ্যে আছে- টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিকাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ই.ই.ই), কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সি.এস.ই), ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আই.পি.ই)। এছাড়া আছে বিবিএ, এমবিএ, এক্সিকিউটিভ এমবিএ, এল.এল.বি.(অনার্স), এল.এল.এম. (ফাইনাল), ইংরেজি বি.এ. (অনার্স), এম এ। ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট-টিএইচএম, অর্থনীতি- বি.এস.এস (অনার্স), এম.এস.এস (দুই বছর), এম.জি.ডি.এস (১ বছর)।  মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য চেষ্টা চলছে, এখনও অনুমোদন মেলেনি। আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করা খুব দরকার। আগেই বলেছি আমি নিজেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এজন বিশেষজ্ঞ।

আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টি সেমিস্টারে ভর্তি করানো হয়?
আমাদের এখানে তিনটি সেশন বা সেমিস্টারে ভর্তি করা হয়। স্প্রিং-সেমিস্টার জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, সামার-সেমিস্টার মে থেকে আগস্ট ও ফল-সেমিস্টার সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর।

লেখাপড়ার মানের দিক থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ?
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের দিক থেকে কোনো ছাড় দিই না। আমি বিদেশের নামী-দামি ইউনিভার্সিটিরতে শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছি, যেমন ইংল্যান্ডের ব্রাডফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং নিউজিল্যান্ডের ওটাগো ইউনিভার্সিটি। শিক্ষার মান উন্নত রাখার জন্য এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত সিস্টেম এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা প্রয়োগ করি। আমরা মনে করি যে, শিক্ষার মান যদি উন্নত করতে হয় তাহলে তিনটি ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। প্রথমত, ভালো শিক্ষক লাগবে। তাকে ভালোভাবে গাইড করতে হবে তিনি কী পড়াবেন, কী পদ্ধতিতে পড়াবেন তা শিখাতে হবে। আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেই। পর্যায়ক্রমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিবছর শিক্ষদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক।

দ্বিতীয়ত, কী পড়াবেন? শিক্ষক নিজের ইচ্ছামতো পড়াতে পারবেন না। প্রত্যেক বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে সিলেবাস অনুযায়ী মডিউল তৈরি করে দেওয়া হয়। এই মডিউলগুলো সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর ওপর পাঠদানের জন্য সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া থাকে। শিক্ষক পাঠদানের সময় এই মডিউল অনুসরণ করেন; তবে এর বাইরেও অনেক আনুষঙ্গিক বিষয় পড়িয়ে থাকেন। প্রত্যেকটা লেকচারের বিষয়ের মূল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে এই মডিউল তৈরি করা হয় এবং সে অনুপাতে তাকে পড়াতে হয়। এখানেও শিক্ষককে প্রশিক্ষিত করে তোলা হয়।

তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের আমরা নকলমুক্ত পরীক্ষার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স ভূমিকা পালন করি। কোনো ধরনের নকল বা অসাধুু উপায় অবলম্বনের সুযোগ এখানে নেই।

আমাদের পড়াশোনা করানোর  মডিউগুলো মোটামুটি বিশ্বমানের। কারণ এগুলো অনলাইনে চলে যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জিত ক্রেডিট বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া আমাদের এখানকার শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮৫ শতাংশ কোনো না কোনো আয়বর্ধনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমি বিশ্বাস করি আমার শিক্ষার্থীরা বাইরে গেলে তারা বড় কিছু অর্জন করে দেখাতে সক্ষম হবে। আমাদের এই ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির ১৫ তলা ভবন নির্মাণের আর্কিটেকচারাল এবং স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বাইরের কোনো স্থাপত্যবিদ বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে তৈরি করা হয়নি। প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ স্কয়ার ফিটের এই ভবনটির আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং শিক্ষার্থীদের দ্বারা সম্পাদন করা হয়েছে। তবে বুয়েটের ল্যাব এ বিভিন্ন পর্যায়ে ভবন নির্মাণকাজের মান টেস্ট করানো হয়েছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেছে ভবন নির্মাণে কোনো ভুলভ্রান্তি নেই। এই ভবনের ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিংসহ সব আনুষঙ্গিক  কাজ এখানকার ইইই-এর শিক্ষার্থীদের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের উন্নত মানের শিক্ষার এক উজ্বল দৃষ্টান্ত এই সুবিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল কমপ্লেক্স।

এখানে পড়াশোনা করতে আসা শিক্ষার্থীরা কী কী ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে?
এখানে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময়মতো ক্লাস করানো হয়। শিক্ষার্থীরা শতভাগ ক্লাস করতে পারে। পড়াশোনার জন্য যে সুন্দর পরিবেশ দরকার সেটি তারা এখানে পাচ্ছে। ক্লাসরুমের বাইরে চিত্তবিনোদনের জন্য বিশাল খোলামেলা পরিবেশ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর। ভালো শিক্ষক দ্বারা পাঠদান করানো হয়। ভালো ইকুইপমেন্ট দিয়ে ল্যাবরেটরিতে বাস্তবমুখী পড়াশোনা করানো হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের এখানে মনিটরিং করা হয়। ভালো ল্যাব ফ্যাসিলিটিস আছে এখানে। এখানে শুধু সিভিল ডিপার্টমেন্টেই ১০০ ল্যাব রয়েছে। কেউ কারো জন্য বসে থাকে এমন অবস্থা হয় না। এখানের পরীক্ষা পদ্ধতিও খুব সুন্দর। চার মাসের সেমিস্টারে ছয়টা পরীক্ষা দিতে হয়। যা পড়ানো হয় তার কতটা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ট্রান্সফার হলো তা ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয় কী ভূমিকা পালন করছে?
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাইরের চিন্তা বা বাজে চিন্তার কোনো অবকাশ দেওয়া হয় না। তারা সব সময় ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এজন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ হাজার শিক্ষার্থী এই গাবতলীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় কোনোদিনও রাস্তা অবরোধ বা ভাঙচুর বা অপ্রীতিকর কোনো পরিস্থিতি তৈরি করেনি। এখানের কোনো শিক্ষার্থী মাদক বা নেশার সঙ্গে জড়িত হয়নি। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা কোনো আন্দোলনে জড়ায়নি। তারা নিজেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর আলোচনা করে, মিটিং করে, সহানুভূতি প্রকাশ করে। কিন্তু ক্লাস বন্ধ রেখে কোনো আন্দোলনে নামেনি।

ইইউবিতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বৃত্তির ব্যবস্থা কেমন?
এখানে তিনটি বিষয়ে খুব নজর দেওয়া হয়। তার মধ্যে মূল যেটা হচ্ছে পড়াশোনার ফি অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম। তথাপি আমরা ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চারবার টিউশন ফি কমিয়েছি। প্রথমবার ১৫ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০, তৃতীয়বার ৪০ এবং সর্বশেষ চতুর্থবার ৫০ শতাংশ টিউশন ফি কমিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা করানো হচ্ছে। এটা ব্যতিক্রমী ব্যাপার। আমরা এই সময়ে শিক্ষকদের বেতন তিনবার বাড়িয়েছি। ২০১২ সালে ১২ হাজার টাকা লেকচারারদের প্রারম্ভিক বেতন ছিল, যা আজ ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমরা স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করেছি। এর কোনো শাখা নেই। আমরা চাই গরিব শিক্ষার্থীরা যেন স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকার হতাশায় না ভোগে। আমাদের ব্যবসায়িক কোনো মনোবৃত্তি নেই। আমরা ট্রাস্টি বোর্ডে যারা আছি তারা এক পয়সাও নিই না। এখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ আছে স্থায়ী ক্যাম্পাসে। এখানে যেহেতু খোলা মাঠের সুবিধা নেই, সুতরাং অনেক বড় করিডোর, খোলামেলা স্থান, বসার স্থান করা হয়েছে এর ভেতরে। এখানকার শিক্ষার্থীদের অভিভাবক আমি। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো। আমার এখানেও তা-ই।

শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধার জন্য বলিয়াপুরে ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। আশা করছি দুই বছরের ভেতর শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল ও খেলার মাঠ তৈরি করে দিতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে হবে হলটি। আমরা বলিয়াপুরে ১০ বিঘা জমি নিয়েছি। আরো ১০ বিঘা জমি ক্রয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা স্বল্প খরচে থাকার মতো হোস্টেল নির্মাণ করব যেন গরিব শিক্ষার্থীরা থাকতে পারে।

দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের দিক থেকে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আমরা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। কারণ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অর্থে নীতিগত মিল নেই। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্যই হলো বিনিয়োগকৃত অর্থ লাভসহ ফেরত পাওয়া। আমরা ব্যবসায়িক নীতি নিয়ে চলি না। আমরা আমাদের মেধা ও সামান্য যা সম্পদ ছিল তাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি নির্মাণ পরিকল্পনা ও পরিচালনা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের প্রথম লক্ষ্যেরই মিল নেই। এছাড়া আমাদের এখানে অর্থ ভাগাভাগির কোনো ব্যাপার নেই। কারণ ট্রাস্টি বোর্ডের নয়জন সদস্যের মধ্যে মূল ডিসিশন মেকার আমরা দুজন- বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি এবং আমি। অন্য যারা সদস্য আছেন তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।

আলোচনার শুরুতে ‘ইটেপ’-এর কথা বলেছিলেন। একটু বিস্তারিত জানতে চাই।
ইটেপ একটি এডুকেশনাল প্রোগ্রাম। এটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। এর একটি হলো ক্যান্টিন। শতাধিক শিক্ষার্থী মিলে পরিচালনা করে এটি। এখানে সব খাবার স্বাস্থ্যসম্মত। এই কেন্টিনে নিয়োজিত শিক্ষার্থীরা এখান থেকে যে বেতন পায় সেটা দিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নেয়।

আমরা ইউবি রিসাইক্লেক্স প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি। এই প্রজেক্টের আওতায় রাজধানীর যে বর্জ্য আসে সেটি নিয়ে কাজ করব। মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি আমাদের প্রজেক্টকে সফল করতে সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখান থেকে প্লাস্টিক, পেট্রোল, ধাতব ও জৈবসার প্রক্রিয়া করে উৎপন্ন করা হবে। এটার জন্য শক্তিশালী টিম গঠন করেছি। আমরা আশা করি এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে যাবে।

এটি হলে একদিকে যেমন দেশের উপকার হবে অন্যদিকে যারা গরিব শিক্ষার্থী তারা এখানে কাজ করতে পারবে। এছাড়াও ইইউবি অনলাইন শপিং প্রকল্পে পূর্ণ ও খণ্ডকালীন চাকরি করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম কেমন?
আমাদের একটি প্রক্টরিয়াল কমিটি আছে। তাদের কাজ হলো প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে বিভিন্ন সংগঠন থেকে দুই-তিনজন করে নিয়ে কাজ করা। এখানে প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টে তিন থেকে চারটি ক্লাব আছে। এর মধ্যে আছে ডিবেট ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব, ড্রামা ক্লাব, কালচারাল ক্লাব প্রভৃতি। তাদের মধ্যে আন্তঃডিপার্টমেন্ট প্রতিযোগিতা যেমন হয় তেমনি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতাতেও আমরা অংশ নিই। এখানে ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়। আমরা ক্লেমন কাপ, ইউল্যাব ফেয়ার প্লে গোল্ডকাপ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ানশিপ কাপ অর্জন করি। আমরা খেলাধুলায়ও যথেষ্ট সক্রিয়। আমাদের এখানে জাতীয় দলের ছয়জন খেলোয়াড় আছে। নাঈমুল ইসলাম, মাশরাফি, শাওন এদের মতো খেলোয়াড় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

ইইউবিতে  কী পূর্ণাঙ্গরূপে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয়?
আমাদের ক্যাম্পাস গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে ডিজিটালাইজড। ক্লাসরুমগুলোতে ডিজিটাল পদ্ধতির সাহায্যে পাঠদান করা হয়ে থাকে। তবে সেটি সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড নয়। সব ক্লাস তো ডিজিটালি সম্ভবও নয়। যেমন প্রাকটিক্যাল ক্লাস। তবে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের ব্যবহার করা হয়। সাউন্ড সিস্টেম আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ ভালোটা দেওয়ার চেষ্টা করি। আগামী মার্চ মাসে বুয়েটের প্রফেসর কায়কোবাদ পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে আমাদের এখানে যোগদান করবেন। আমরা পুরো ক্যাম্পাসকে ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।

আপনাদের লাইব্রেরি কতটা সমৃদ্ধ?
লাইব্রেরি অনেকটাই সমৃদ্ধ। আমরা সব সময় পাঠ্যপুস্তক হালনাগাদ রাখি। আমাদের লাইব্রেরির একটা পার্ট অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। আমাদের মডিউল আর্কাইভ ডিপার্টমেন্ট আছে। এর কাজ হচ্ছে প্রত্যেকটা সাবজেক্টের যে মডিউল আছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, এক সিভিল ডিপার্টমেন্টেই ১৪৬টি মডিউল আছে। এগুলোর সব অনলাইন সংস্করণ আছে। ইচ্ছা করলেই শিক্ষার্থীরা দেখতে পারে। কপি করতে পারে। তাদের এখন লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে বসে খুঁজে পড়তে হয় না। এরপরও দরকার পড়লে তাদের জন্য সাপ্লিমেন্টারি তো আছেই। সুতরাং বলতে পারি আমাদের লাইব্রেরি অনেক সমৃদ্ধ।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
আমাদের দেশের শিক্ষার মান খুব একটা খারাপ নয়। এর দুইটা কারণ আমি বলতে পারি। আমি একজন অর্থনীতিবিদ। এদেশের শুরু থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা আমার মুখস্থ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কত ছিল আর এখন কত? এটা যদি দেখা হয়, বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে এই সাবকন্টিনেন্টে আমাদের ধারেকাছে কেউ আসতে পারেনি। শুরুতে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ৬৮ ডলার সেখানে পাকিস্তানের ছিল ২০০ ডলার। এখন আমরা ১৯০০ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছি। পাকিস্তান নিজেরা বলে ১৫০০ ডলার। কিন্তু ১২০০ ডলার থেকে ১৫০০ ডলারের মধ্যে আছে। এটা বিতর্কিত। বিশ্বব্যাংক বলে ১২০০ ডলার। ইন্ডিয়া বর্তমানে ১৭০০ ডলার। আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ (৮.৫%) সারা পৃথিবীতে চতুর্থ অবস্থানে আছে। পাকিস্তানের আসন বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ১০০-এর নিচে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের অর্জিত সাফল্য প্রমাণ করে আমাদের দেশের শিক্ষার মান অন্যান্য দেশের তুলনায় অবশ্যই উন্নত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের র‌্যাংকিংয়ে আমরা পিছিয়ে কেন?
ওগুলো কোনো র‌্যাংকিংই নয়। আমার দেশের উন্নতি হচ্ছে। সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর তারা বসে বসে আমাদের র‌্যাংকিংয়ে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। ওটা কোনো র‌্যাংকিংই নয়। এসব আমি বিশ্বাস করি না। আমি শুধু বাংলাদেশ নয় বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। আমি বলছি এগুলো সব বানানো কাহিনি। বলা হয় রিসার্চ হয় না। আমার এখানে আগে রিসার্চ দরকার না শিক্ষার্থীর বসার জায়গা দেওয়া দরকার? শিক্ষকদের গবেষণা কখন হয়? যখন সবকিছু স্ট্যাবল হয়।

আমরা জার্নাল প্রকাশ করি কিন্তু অগ্রাধিকার দিচ্ছি বিল্ডিং বানানোতে। কেন? কারণ আমার শিক্ষার্থীর বেসিক প্রয়োজনটা পূরণ করতে হবে। পাকিস্তানের ইমরান খান ক্ষমতায় এসেই প্রথম যে কথা বলেছেন, বাংলাদেশকে আমরা ‘রোল মডেল’ হিসেবে ধরেছি। পাকিস্তানের চেয়ে যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা খারাপ হতো তাহলে আমাদের দেশের এই উন্নয়ন কীভাবে হচ্ছে? আমি কোনোভাবেই স্বীকার করি না যে, আমাদের দেশের শিক্ষার মান এই উপমহাদেশের অন্য কোনো দেশের চেয়ে খারাপ। আর বিদেশি শিক্ষার্থী কমে গেছে? আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদেরই তো আসন সংকট আছে। বিদেশিদের জায়গা দেব কীভাবে? আর বিদেশিদের পড়ানো হচ্ছে এক প্রকারে ব্যবসা। অনেক মোটা অঙ্কের অর্থ পাওয়া যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়।

আপনাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন। 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার ‘রোল মডেল’। আমি ভারতের শিক্ষকও এনেছি এখানে। তাদের সিলেবাস আমি দেখেছি। মালয়েশিয়ার শিক্ষকও এখানে এসেছে। আমরা গুণগত মানের দিক দিয়ে কোনোভাবেই তাদের চেয়ে খারাপ নই। শিক্ষার দুটি দিক আছে। একটি থিওরিটিক্যাল আর একটি যুগোপযোগী/লাগসই। আমি মনে করি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা যদি যুগোপযোগী/লাগসই শিক্ষায় শিক্ষিত না হতো তাহলে এদেশ কখনো ‘রোল মডেল’ হতে পারত না। আমি যখন ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বব্যাংকে যোগদান করি, তখন এদেশের টেক্সটাইল শিল্পের রপ্তানি আয় ছিল ৩০০ মিলিয়ন ডলার যা ২০১৯ সালে পৌঁছেছে ৩৮ বিলিয়ন ডলারে। ১৯৮৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের টেক্সটাইল শিল্পের রপ্তানি আয় ছিল যথাক্রমে ৬ ও ৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালে পৌঁছেছে যথাক্রমে ১৮ ও ১৫ বিলিয়ন ডলারে। এই অর্জন কি সহজ কথা? আমার দেশের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মান উন্নত না হলে রপ্তানিমুখী টেক্সটাইল শিল্পের এই ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি ঘটলো কেমন করে? যে শিক্ষা স্বপ্ন দেখাতে পারে না সে শিক্ষার দরকার নেই। এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; তাই এই শিক্ষা মানুষের ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি করেছে। সুতরাং এখানের শিক্ষাব্যবস্থা অবশ্যই ভালো এবং লাগসই।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার উপদেশ কী থাকবে?
শিক্ষার্থী বন্ধুদের বলছি, আমি মনে করি এদেশে জন্মগ্রহণ করে তোমরা ভাগ্যবান। গরিব ঘরে জন্মাতে পারো কিন্তু তোমাদের এই দারিদ্র্যের এই চাপ না থাকলে এই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন কখনই সম্ভব হতো না। দারিদ্র্য আমাদের অলংকার। আমরা অনেক আশাবাদী, জিদ্দি। আমরা লেখাপড়ায় অনেক বেশি মনোযোগ দেব, আরো ভালো করব। আর্থিক অনটনকে সৌভাগ্য মনে করে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিতে এখন ২৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে এক লাখে। আমি আশাবাদী আমাদের ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। আমার শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে দেখি, আমার সন্তান হিসেবে দেখি। আমি কোনোদিনও তাদের অবমূল্যায়ন করি না। তাদের আরো মূল্য সংযোজন করে দেব আমরা। তারা যেন জীবনে শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পারে। লেখাপড়া করে শুধু ডিগ্রি অর্জন করলে চলবে না; যদি সে ডিগ্রি কোনো কাজে না আসে তাহলে লাভ কী? কাজেই শিক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। কর্মে নিযুক্ত হতে হবে। দেশকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। আমি নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। এখানে তোমাদের দায়বদ্ধতা অনেক। দেশকে অনেক কিছু তোমাদের দিতে হবে। অবদান রাখতে হবে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :