১৬ বছরে নৌদুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৮২২, নিখোঁজ ৮৬৪

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১৩:০১ | প্রকাশিত : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:৪৮

রবিবার নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ নামের একটি লঞ্চ ডুবে গেলে মারা গেছে ২৭ জন। গত বছরের ২৯ জুন ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে এমএল মর্নিং বার্ড নামের একটি লঞ্চ অপর এক লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে গেলে ৩২ জন প্রাণ হারান। গতকালের ২৭ জন ছাড়া গত ১৬ বছরে বিভিন্ন নৌ দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১ হাজার ৮২২ জন এবং নিখোঁজ হয়েছেন ৮৬৪ জন। এই নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম মৃতের তালিকায় না উঠলেও দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের সন্ধান পাননি স্বজনরা।

সব দুর্ঘটনার বেলাতেই তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু তার সুপারিশ খুব কমই বাস্তবায়ন হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ ডোবার পর গতকাল দুপুরে উদ্ধারকারী জাহাজের সহায়তায় লঞ্চটি তীরে আনা হয়। এরপর সেটির ভেতর থেকে একের পর এক ২২টি মরদেহ বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। তার আগে উদ্ধার করা হয়েছিল ৫টি মরদেহ। লঞ্চডুবির এই ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) মো. রফিকুল ইসলামকে তদন্ত কমিটির প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়।

এর আগে গত বছর ২৯ জুন ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে এমএল মর্নিং বার্ড নামে একটি লঞ্চডুবির ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

জানা গেছে, বিগত সময়ের নৌদুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর শতাধিক প্রতিবেদন পড়ে রয়েছে। সেসব প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা কিংবা তার সুপারিশ নিয়ে কোনো অগ্রগতি না থাকায় নিয়মিত লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১৬ বছরের দুর্ঘটনা পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) নৌদুর্ঘটনা বিষয়ক এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে দেশে নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৭৬টি। এতে প্রাণ গেছে ১ হাজার ৮২২ জনের। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে আরও ৪১৯ জন। আর নিখোঁজ হয়েছেন ৮৬৪ জন।

পরিসংখ্যানমতে, ২০০৫ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২৯টি, এতে প্রাণ যায় ৩১৬ জনের, আহত হন ৭ জন এবং নিখোঁজ হয় ২৬ জন। ২০০৬ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২১টি, এতে প্রাণ যায় ৫০ জনের, আহত হন ৫৪ জন এবং নিখোঁজ হয় ১০ জন। ২০০৭ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ১২টি, এতে প্রাণ যায় ৯ জনের, আহত হন ৮ জন। ২০০৮ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২১টি, এতে প্রাণ যায় ১১৩ জনের, আহত হন ২৫ জন এবং নিখোঁজ হয় ১১ জন। ২০০৯ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ৩১টি, এতে প্রাণ যায় ২৫১ জনের, আহত হন ১২ জন এবং নিখোঁজ হয় ২২ জন। ২০১০ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ৩১টি, এতে প্রাণ যায় ১০৮ জনের, আহত হন ২২ জন এবং নিখোঁজ হয় ৮৬ জন। ২০১১ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২২টি, এতে প্রাণ যায় ৭৬ জনের, আহত হন ২ জন এবং নিখোঁজ হয় ২৫ জন। ২০১২ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ১৫টি, এতে প্রাণ যায় ১৬১ জনের, আহত হন ৩ জন।২০১৩ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ৮টি, এতে প্রাণ যায় ২২ জন। নিখোঁজ হয় ৩ জন। ২০১৪ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ১৭টি, এতে প্রাণ যায় ১২৪ জনের, আহত হন ১ জন এবং নিখোঁজ হয় ৬৭ জন। ২০১৫ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২২টি, এতে প্রাণ যায় ১২০ জন। ২০১৬ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ৯টি, এতে প্রাণ যায় ৩৫ জনের, আহত হন ১ জন এবং নিখোঁজ হয় ১৫ জন। ২০১৭ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২৬টি, এতে প্রাণ যায় ৪৫ জন। ২০১৮ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৫টি, এতে প্রাণ যায় ১৮ জনের, আহত হন ৬৮ জন এবং নিখোঁজ হয় ১১৮ জন। ২০১৯ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ১৫১টি, এতে প্রাণ যায় ১১০ জনের, আহত হন ১৪৯ জন এবং নিখোঁজ হয় ২৪৪ জন। ২০২০ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ১২৬টি, এতে প্রাণ যায় ২৬৪ জনের, আহত হন ৬৭ জন এবং নিখোঁজ হয় ২৩৭ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিগত সময়ে দেশে যেসব নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে তার কারণ অনুসন্ধ্যানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটিগুলো সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে, এমন শতাধিক প্রতিবেদন পড়ে রয়েছে। সেসব প্রতিবেদনের সুপারিম বাস্তবায়ন করলে নৌ দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী।

ঢাকা টাইমসকে মীর তারেক আলী বলেন, ‘দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, তদন্ত কমিটি হচ্ছে। বিগত সময়ের দুর্ঘটনাগুলোর কারণ অনুসন্ধ্যানে যেসব তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারা সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এমন শতাধিক প্রতিবেদন পড়ে রয়েছে। সেগুলো খুলেও দেখা হয়নি বলে মনে হয়। দীর্ঘদিনের ব্যবধানেও হলেও এখন সেসব প্রতিবেদন নিয়ে বসতে হবে। তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে নৌদুর্ঘটনা কমানোর পথ বেরিয়ে আসতে পারে।

ঢাকাটাইমসকে মীর তারেক আলী বলেন, পরামর্শগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করা দরকার। একটা টার্গেট নেয়া দরকার, যে এই এই সুপারিশগুলো আগামী ৫ বছরের মধ্যে বা ১০ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করব। এভাবে যদি আগানো যায় তাহলে আমার মনে হয় কিছুটা হলেও এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।’

নৌযান নিরীক্ষক (সার্ভেয়ার) ও নিরীক্ষার মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন আছে। নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষার নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতবদল হয় নৌযান মালিক ও নিরীক্ষকদের মধ্যে। সূত্র বলছে, দেশে নৌযান নিরীক্ষিক আছেন মোট ৫ জন। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞদের মতামত, নিরীক্ষক বৃদ্ধির পাশাপাশি যেন নিরীক্ষা কাজটাও স্বচ্ছ হয়।

শীতলক্ষ্যার দুর্ঘটনা ও গত বছরের সদরঘাটের দুর্ঘটনা, দুটিই চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া চালনার ফল বলে জানান মীর তারেক আলী। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ঠিকভাবে নিরীক্ষা হলেও এসব অদক্ষ চালক দিয়ে লঞ্চ চালাতে পারতেন না মালিকরা।

দেশে নৌযানের সংখ্যা কত তার সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় নৌযানচালকও খুবই কম। আর দেশের নৌরুটে অদক্ষ চালক দিয়ে নৌযান পরিচালনা করা হচ্ছে। চালকদের দক্ষতা বিচার না করে শুধু পদোন্নতির জন্য মাত্র ছয় মাসের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। পদোন্নতির পর্যায় ছাড়া আরও কোনো ক্ষেত্রেই নৌযান চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অদক্ষ চালক দক্ষতার সনদ পাচ্ছেন।

এ প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছ করার তাগিদ দিয়ে বুয়েটের নৌ দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ মীর তারেক আলী বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের মাস্টার বা ড্রাইভাররা যখন লাইসেন্সটা পান, এই প্রক্রিয়াটাও কিন্তু স্বচ্ছ না। এখানে অনেক ধরনের ব্যাপার আছে। পরীক্ষা দিয়ে একজন অনুমোদন পাবে এটা নিশ্চিত করতে হবে। যে পরিমাণ নৌযান আছে সে পরিমাণ চালক নাই।‘

ছোট নৌযানের বিষয়ে মীর তারেক আলী বলেন, ‘মর্নিং বার্ড ও গতকাল যে দুর্ঘটনা ঘটল এ ধরনের নৌযানগুলো খোলের (ডেকের নিচে) মধ্যে যাত্রী নেয়। কিন্তু একটা যাত্রীবাহী নৌযানের সংজ্ঞায় এটা পড়ে না। নৌযান পানির মধ্যে কাত হবেই, সেটা আপনি যত ভালোই ডিজাইন করেন। কিন্তু কাত হলেই ডুবে যাবে না। এ ব্যাপারে একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে এগুলো চলাচলের জন্য আনফিট। তদন্ত প্রতিবেদনে আমরা এ নৌযানগুলো তুলে ফেলার সুপারিশ করেছি। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই।’

(ঢাকাটাইমস/৫এপ্রিল/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :