দুদকের তদন্তের মধ্যেই সাউথ বাংলা ছাড়লেন আমজাদ

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৬

ক্ষমতার অপব্যবহার করে নামে-বেনামে ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ এবং পাচারের অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকের চেয়ারম্যান এস এম আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনেও তার অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্তও শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরমধ্যেই হঠাৎ পদত্যাগ করলেন প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নয় বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা আমজাদ হোসেন।

বিএফআইইউ এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ব্যাংকটির বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতে তিনি ব্যবহার করেছেন নিজের, স্ত্রীর, আপন ভাই, ভাতিজিসহ কর্মচারীদের নাম। এসব ব্যক্তি ও কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে ব্যাংকের বোর্ড সভায় এসব ঋণের অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে তার অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি উঠে এসেছে।

অভিযোগ আছে, আমজাদ হোসেন তার নিজ এলাকার সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের খুলনা ও কাঁটাখালি দুটি শাখার মাধ্যমে মূলত এসব অর্থ ছাড় করার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন। আর যেসব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয় তার প্রতিটিরই মালিক কোনো না কোনোভাবে তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা।

নিজের ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়েই ক্ষ্যান্ত হননি আমজাদ হোসেন। সরকারি-বেসরকারি চারটি ব্যাংকে তার ঋণ রয়েছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। এসব ঋণের আদায় পরিস্থিতিও সুবিধাজনক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ ও দুদকের তদন্তেও এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণও অনেকটা তার দখলে ছিল। ব্যাংকটিতে আমজাদ পরিবারের নামেই রয়েছে ১১৭ কোটি টাকার শেয়ার। যা ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের ১৭ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠার পর অর্থাৎ ২০১৩ সাল থেকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে ছিলেন এস এম আমজাদ হোসেন। পরে বিভিন্ন সময়ে তার আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর। কমিশনে আসা অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তের পর ২০১৭ সালে প্রথমবার তার বিরুদ্ধে ২০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। ওই সময় কমিশন আমজাদ হোসেনের দুর্নীতির অনুসন্ধানের দায়িত্ব ছিলেন দুদক উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

গত আগস্ট মাসে দুদক দি¦তীয় দফা এস এম আমজাদ হোসেনের অর্থ আত্মসাতের বিষয় অনুসন্ধান ও তদন্তের সিদ্ধান্ত নিলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সম্প্রতি তিনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কাছে পদত্যাগপত্র ইমেইল করে পাঠান। এতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে যাবার কারণ হিসেবে নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের পর্ষদ সভায় নতুন সভাপতি নির্বাচন করার কথা রয়েছে।

এর আগে গত ৫ জানুয়ারি ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আমজাদ হোসেনের নামে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনে চিঠি দেয় দুদক। ওই চিঠিতে বলা হয় ‘আমজাদ হোসেন সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কর্মাস ব্যাংকের শেয়ারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। এসব অর্থ অবৈধ প্রক্রিয়ায় দেশের বাইরে পাচারের চেষ্টা করছেন, যা মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ।’

নামে-বেনামে ঋণ জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থ পাচার ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধরা পড়ে। দুদকের তদন্তে অর্থ আত্মসাতের সত্যতা পেলে চিঠির মাধ্যমে তার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের নির্দেশ দেয় দুদক। সেই সঙ্গে তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেয় সংস্থাটি। পরে গত বছরে ৯ জানুয়ারিতে এসএম আমজাদ হোসেন, তার স্ত্রী সুফিয়া আমজাদ ও মেয়ে তাজরির আমজাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে দুদক।

যে যে কোম্পানির নামে ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন

দুদক সূত্রে জানা যায়, এস এম আমজাদ হোসেন ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্নজনের নামে বিপুল অংকের ঋণ দেন। এসব অর্থ পরবর্তী সময়ে নিজে ভোগ দখল করেছেন।

বিএফআইইউ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে আলফা এক্সেসরিজ অ্যান্ড এগ্রো এক্সপোর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে এসবিএসি ব্যাংক থেকে ৪৮ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে। আলফা এক্সেসরিজের মালিক মহফুজা খাতুন বয়স মাত্র ২০ বছর। তিনি সম্পর্কে এসবিএসির চেয়ারম্যান এস এম আমজাদ হোসেনের ভাতিজি। মূলত এই টাকাটি গিয়েছে আমজাদ হোসেনের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান লকপুর গ্রুপে।

এছাড়া ২০১৬ সালের ১ জুন এসবিএসি ব্যাংকের খুলনা শাখায় ‘খুলনা বিল্ডার্স’ নামে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেন। পরে এই ঋণসীমা বাড়িয়ে ২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা করা হয়। এই ঋণটি করা হয় খুলনা বিল্ডার্সে গোডাউনে ৫০ কোটি টাকার মালামাল আছে দেখিয়ে। কিন্তু ওই গোডাউনের কোনো অস্তিত¦ই পায়নি বিএফআইইউ। মূলত খুলনা বিল্ডার্সে ৪৯ শতাংশের মালিক আমজাদ হোসেনের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন। বাকি ৫১ শতাংশের মালিক তিনি নিজেই।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ব্যাংকটির খুলনা শাখা খেকে নয় ব্যক্তির নামে ২২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, যার বিপরীতে মাত্র পাঁচ কোটি টাকা আমানত প্রদর্শন করা হয়। এই ঋণের ক্ষেত্রে স্থায়ী আমানতের ৪৫০ শতাংশের বেশি টাকা উত্তোলন করা হয়। ঋণের ক্ষেত্র যে পাঁচ কোটি টাকা আমানত দেখানো হয় সেটিও ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের স্ত্রীর মালিকানাধীন সাউদার্ন ফুড নামের প্রতিষ্ঠানের।

শুধু ঋণই নয়, তার বিরুদ্ধে করোনাকালীন প্রণোদনার অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ আছে। মুনস্টার নামক জুটমিলের শ্রমিকদের বেতনের ভুয়া তথ্য প্রদানের মাধ্যমে আমজাদ হোসেন অবৈধভাবে কোটি টাকা সহজ শর্তে সহায়তা নিয়েছেন। একইভাবে ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর তিনি তার ছয় প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির বিপরীতে সরকারের তহবিল থেকে ৪২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা নগদ সহায়তা ভোগ করেছেন। অডিট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষেত্রে তিনি ২৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত নিয়েছেন।

দেশে-বিদেশে তার যত প্রতিষ্ঠান

এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানেরর নামে যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে অর্থ ছাড় করা হয়েছে সেগুলো হলো-লকপুর ফিশ প্রসেস কোম্পানি লিমিটেড, বাগেরহাট সিফুড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, শম্পা আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড, রূপসা ফিশ অ্যান্ড অ্যালাইড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, মুনস্টার ফিশ লিমিটেড, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, খুলনা এগ্রো এক্সপোর্ট প্রাইভেড লিমিটেড, ইস্টার্ন পলিমার লিমিটেড, মেট্রা অটো ব্রিকস লিমিটেড ও খুলনা বিল্ডার্স লিমিটেড। উল্লিখিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই এস এম আমজাদ হোসেনের মালিকানাধীন লকপুর গ্রুপের।

(ঢাকাটাইমস/২২সেপ্টেম্বর/এসআর/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :