সীমান্ত দিয়ে সত্যিই কি জ্বালানি তেল পাচার হয়?

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ১১:২১ | প্রকাশিত : ০৬ আগস্ট ২০২২, ২২:০১
ফাইল ছবি

সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের অভিযোগ বেশ পুরোনো। পাচার ঠেকাতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে গুঞ্জন চলছিল। পাচার ঠেকানো এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের দোহাই দিয়ে শুক্রবার রাত থেকে দেশের বাজারে বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সম্প্রতি জানায়, তেল চোরাচালানের ফলে বিপুল রাজস্ব হারাতে শুরু করেছে দেশ। সীমান্ত এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে তাই তারা মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানায়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পাচার রোধের যে কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবের বেশ ফারাক বলে মনে করেন বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সীমান্ত দিয়ে হরহামেশা তেল পাচার হওয়া এখন অনেক কঠিন।

বিজিবির দেওয়া তথ্যমতে, সীমান্ত এলাকা দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার রোধে বিজিবির সার্বক্ষণিক টহল কার্যক্রম ও কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গত বছর সীমান্তে জ্বালানি তেল আটক না হলেও এ বছরের ৬ আগস্ট পর্যন্ত ৭১১ লিটার তেল আটক করা হয়েছে।

সীমান্ত দিয়ে আগে তেল পাচার হতো, তবে এখন তা খুবই কম বলে জানান বিজিবি কর্মকর্তারা। ঢাকা টাইমসকে তারা বলেন, ‘ভারত থেকে যেসব মালবাহী লরি বা ট্রাক আসে, তারা যাবার সময় ট্যাংকিতে অতিরিক্ত তেল লোড করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বিজিবির তৎপরতায় সেটা অনেক কমে এসেছে।

তাছাড়া মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে মাছধরার ট্রলারে তেল পাচার হতো, সেটাও খুবই কম বলে জানান বিজিবি কর্মকর্তারা।

বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) ঢাকাটাইমসকে বলেন, 'বর্তমান সরকারের কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পাচার রোধকল্পে বদ্ধপরিকর। সীমান্ত এলাকা দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার রোধে বিজিবির সার্বক্ষণিক টহল কার্যক্রম পরিচালনা করাসহ ব্যাপক তল্লাশি ও কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।’

গত বছর সীমান্তে জ্বালানি তেল আটক না হলেও এ বছরের ৬ আগস্ট পর্যন্ত ৭১১ লিটার তেল আটক করা হয়েছে বলে জানান বিজিবির পরিচালক (অপারেশন)।

বিজিবির বেশ কয়েকটি ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয় ঢাকাটাইমস প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার ঠেকাতে গত মাসে সরকারের পক্ষ থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এরপর সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়।

জ্বালানি তেল পাচারের প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বিজিবি কর্মকর্তারা বলেন, একসময় তেল পাচারে ‘ঢপ’ নামের একধরনের প্লাস্টিকের জার ব্যবহার হতো। সেই ‘ঢপ’ ভর্তি তেল সীমান্তের কাঁটাতার দিয়ে পাশের দেশে পাচার করা কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য চোরাকারবারিরা তেল পাচারে তেমন আগ্রহ দেখায় না। আর বিশেষ করে সীমান্তে বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে তেল পাচার প্রায় শূন্যের কোটায়।

আগে বেনাপোলসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে পণ্য নিয়ে আসা ভারতীয় ট্রাক ফিরে যাওয়ার সময় জ্বালানি ট্যাংকিতে তেল নেওয়ার চেষ্টা করলেও এখন সেটি বন্ধ বলে জানান বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির একটি সূত্র।

সূত্রটি বলছে, ‘শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশের চেয়ে ওপারে (ভারতে) ডিজেলের দাম বেশি ছিল। তখন বিভিন্ন তেল পাম্প থেকে ব্যারেল ভরে এনে বন্দরের আশপাশের বিভিন্ন স্থানে রেখে পাইপের মাধ্যমে ভারতীয় ট্রাকের ট্যাংকিতে ভরে দিত। তবে বেশ কিছুদিন বিজিবির কড়াকড়ি আরোপ থাকায় এসব সিন্ডিকেট চুপসে গেছে।’

বিজিবির যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল বন্দর ও সীমান্ত দিয়ে ডিজেল পাচার ঠেকাতে কঠোর নজরদারি ছিল তাদের। ভারত থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে বেনাপোল বন্দরে আসা ট্রাকের তেলের ট্যাংকি স্কেল দিয়ে পরিমাপ করে রেজিস্ট্রার খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। ওই ট্রাক পণ্য খালাস করে ফিরে যাওয়ার সময় আবার পরিমাপ করা হয়। এক্ষেত্রে বাড়তি তেল নিয়ে ভারতে যাবার সুযোগ হয়নি। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিজিবির একটি ব্যাটালিয়নের সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, একসময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে তেল পাচার হতো। কারণ ওই দেশে তেলের দাম অনেক বেশি ছিল। তারা তেল নেওয়ার পর বাংলাদেশি মুদ্রায় দাম পরিশোধ করত। এতে চোরাকারবারিরা বেশি লাভবান হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবধান কমে আসায় এ ধরনের পাচারও কমে আসে। এ ছাড়া আর কীভাবে তেল পাচার হয় আমার জানা নেই।’

দেশে শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি ডিজেল ও কেরোসিন ৩৪ টাকা বেড়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা ও পেট্রোল ৪৪ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা হয়। দেশে জ্বালানি তেলের দাম একবারে এত বেশি আর কখনো বাড়েনি।

কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম মোর্শেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার হয় এমন কোনো তথ্য স্থানীয়রা আমাদের জানায়নি। তাছাড়া স্থানীয় গণমাধ্যমেও এমন খবর কখনো আসেনি। এই এলাকার বর্ডার কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। সেখানে এমন পাচারকারী আছে বলে আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্টও নেই।’

গেল ঈদে চামড়া ও তেল পাচারের একটা আশঙ্কা ছিল জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কিন্তু বিজিবির সতর্কতায় সেটা সম্ভব হয়নি। আর এখন তো দাম সমান হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে চিন্তা নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকার যখন বলছেন পাচার হয় তাহলে সেটা হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন এই সীমান্তে কাজ করেও এমন কিছু জানতে পারিনি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিজিবির বলছে, ‘পাচার হচ্ছে না বা হবে না- এটা আমরা কখনো বলতে পারব না। যখন একটা জায়গায় দুটি দেশের সীমানা থাকবে আর দামের হেরফের থাকে, সেখানে পণ্য চোরাচালানের আশঙ্কা থেকে যায়। সেদিক থেকে আমরা সীমান্তে সচেতন থেকেছি।’

সুনামগঞ্জ বিজিবি বলছে, ‘এই সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় চোরাকারবারিদের তেল পাচারের চেষ্টা চালাতে কখনও দেখিনি।

মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৩৪ ব্যাটালিয়নের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের কোনো অভিযোগ কখনও শুনিনি। তবে জেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে অনেক সময় আলোচনা হয়েছে, মিয়ানমারে জ্বালানি তেলের দাম বেশি, সেখানে তেল পাচার হয়ে যেতে পারে। আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি। তবে এখন পর্যন্ত তেল আটকের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

(ঢাকাটাইমস/০৬আগস্ট/এসএস/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :