গবেষণা চুরির অভিযোগ, ‘ষড়যন্ত্র’ বললেন ঢাবি শিক্ষক রেবেকা সুলতানা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রেবেকা সুলতানার বিরুদ্ধে পিএইচডি থিসিসে (অভিসন্দর্ভ) গবেষণা চুরির (চৌর্যবৃত্তি) অভিযোগ উঠেছে। ওই গবেষণায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য উপস্থাপনেরও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তবে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ নাকচ করে ড. রেবেকা সুলতানা ঢাকা টাইমসকে দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

এর আগেও ঢাবির কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে পিএইচডি ডিগ্রী সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ওঠে। একজন শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল করা হয়। আরও তিন জন শিক্ষককে পদাবননি দেওয়া হয়। এর মধ্যে আইনি লড়াই করে সামিয়া রহমান অধ্যাপক পদ ফিরে পান উচ্চ আদালতের নির্দেশে।

দর্শন বিভাগের শিক্ষক রেবেকা সুলতানার পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া ওই লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রদর্শনে গণতন্ত্রের অবস্থান এবং বাংলাদেশে এর প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক গবেষণার ১৬৩ নম্বর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ বলা হয়েছে।

গবেষণার প্রথম অধ্যায়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত শিবনারায়ন রায়ের ‘গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’ প্রবন্ধের অংশ বিশেষ তথ্যের উৎস উল্লেখ না করে রেবেকা সুলতানা নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছেন।

২১ নম্বর পৃষ্ঠায় অনাদিকুমার মহাপত্রের ‘আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান’ গ্রন্থ থেকে, ৫ম অধ্যায়ে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বর্ণনা করতে গিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাদেশ জ্ঞানকোষ এবং এসএম আনোয়ারা বেগম ও হারুন রশীদের প্রবন্ধ থেকে তথ্য চুরি করা হয়েছে। এছাড়া গবেষণার ষষ্ঠ অধ্যায়টি গবেষণা প্রকাশের আগেই ঢাবির জার্নাল অব সোশিওলজিতে হুবহু প্রকাশ করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে অভিযোগে।

ওই লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, রেবেকা সুলতানা তার গবেষণার ৫ম অধ্যায়ে ৩০ শতাংশ এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ে ৫৩ শতাংশ তথ্য চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। থিসিসটি মৌলিকতাহীন অভিযোগ করে এ বিষয়ে তদন্ত করার দাবি জানানো হয়।

অভিযোগের বিষয়ে রেবেকা সুলতানা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি সঠিক নিয়মে থিসিস সম্পন্ন করেছি। দেড় বছর ধরে তা মূল্যায়ন করে আমাকে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। দর্শন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বাইরের একজন শত্রুতাবশত আমার সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের এই অধ্যাপক মন্তব্য করেন, অকারণে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে পাঠদানের মানসিকতা বাধাগ্রস্ত হয়। মন ভেঙে যায়। এসব ঘটলে শিক্ষকরা পাঠদানে মনযোগও হারান। আর এতে বিশ^বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে উল্লেখ করে রেবেকা সুলতানা বলেন, ‘তিন থেকে সাড়ে তিন বছর ধরে কষ্ট করে থিসিসটি সম্পন্ন করেছি। আমি বিশ্বদ্যিালয়ে পদ-পদবি বা রাজনীতি করে নেতা হতে আসিনি। আমি শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা দেব, এটাই করছি।’

এদিকে রেবেকা সুলতানা পিএইচডি থিসিস সম্পন্ন করেছেন অধ্যাপক ড. এ কে এম হারুনার রশীদের অধীনে। তিনি তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন থিসিসের। ড. হারুনার রশীদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘থিসিসটি দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। রেবেকা সুলতানা সঠিকভাবেই থিসিস সম্পন্ন করেছেন। তথ্যচুরি বা জালিয়াতির কোন বিষয় দৃষ্টিতে আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সভায়ও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। রেবেকা সঠিক আছেন, ওই অভিযোগে তার কিছু হবে না।

ড. হারুনার রশীদ বলেন, ‘জাবির ওই শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না পাওয়ায় রেবেকার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আগেও তুলেছিলেন।’

এদিকে পিএইচডিতে থিসিস বিষয়ক চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঢাবির প্রো-ভিসি (একাডেমিক) ড. মাকসুদ কামাল ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এসব অভিযোগের বিষয়ে গবেষণার মৌলিকত্ব সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করে সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সকল অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।’

প্রসঙ্গত, গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগে গত ৩০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক আবুল কালাম লুৎফুল কবীরের পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। একই সঙ্গে তাকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপকে পদাবনতি করা হয়।

তিনি ‘টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড এইচআইভি কো-রিলেশন অ্যান্ড কো-ইনফেকশন ইন বাংলাদেশ: অ্যান এক্সপ্লোরেশন অব দেয়ার ইমপ্যাক্টস অন পাবলিক হেলথ’ শীর্ষক পিএইচডি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি করেছিলেন।

এর আগে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সংগীতশিল্পী মহসিনা আক্তার খানমের (লীনা তাপসী খান) একটি গ্রন্থে চৌর্যবৃত্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

এছাড়া গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিয়া রহমান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওমর ফারুক এবং অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মাহফুজুল হক মারজানকে পদাবনতি করা হয়।

পরে অবশ্য আইনি লড়াই করে গেল আগস্ট মাসে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পদ ফিরে পান সামিয়া রহমান। উচ্চ আদালত তার সকল সুযোগ-সুবিধা ফিরিয়ে দিতে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।

(ঢাকাটাইমস/২৮সেপ্টেম্বর/আরআর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :