সাত বছর ধরে বেতন নিচ্ছেন দপ্তরি, ডিউটি করেননি সাতদিনও

রুদ্র রাসেল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২২, ২২:৪৯ | প্রকাশিত : ০৫ নভেম্বর ২০২২, ২২:১৭

দায়িত্ব পালন না করেও সাত বছর ধরে বেতন তুলে নিচ্ছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ৯৭ নম্বর একরামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক প্রহরী কাম দপ্তরি। তার নাম ইমরান খান। স্থানীয়রা বলছেন, ইমরান গত সাত বছরে সাত দিনও স্কুলে ডিউটি করেননি। তবু এখনও বহাল রয়েছে তার চাকরি।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে স্কুলটিতে গিয়ে ইমরানকে কর্তব্যরত পাওয়া যায়নি। স্কুলের হাজিরা খাতায়ও তার কোনো স্বাক্ষর নেই। এরপরও স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন কুমার সাফাই গেয়ে বলেন, ‘ইমরানকে বাজারে পাঠিয়েছি।’ হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টিও ধামাচাপা দিতে নিজের ঘাড়েই দোষ নেন প্রধান শিক্ষক। বলেন, ‘ইমরান স্কুলে আসে, কিন্তু আমিই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করাইনি।’ প্রধান শিক্ষকের এমন রহস্যজনক আচরণে স্কুলটিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তারা বলছেন, ‘দায়িত্বপালন না করা দপ্তরিকে শেল্টার দেওয়ার পেছনের রহস্য কি?’

তবে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে শনিবার তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। রবিবার ওই কার্যালয়ের একটি দল সরেজমিনে ওই স্কুল পরিদর্শনে যাবে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট স্কুলের তথ্য বলছে, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে মাসিক ৭০০০ টাকা বেতনে ওই স্কুলে নিয়োগ পান ইমরান। নিজে ডিউটি না করে অন্য লোক পাঠিয়ে বদলি ডিউটি করানো শুরু করেন। ওই বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত ৫ মাসে সরকারি ৩৫ হাজার টাকা ‘অবৈধভাবে’ বেতন গ্রহণ করেন। এত অনিয়মের পরও ২০১৫ সালের আগস্ট মাস থেকে তার মাসিক বেতন বেড়ে ১৪ হাজার ৩০০ টাকা হয়। সে হিসাবে সেই থেকে চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৮৭ মাসে মোট বেতন উত্তোলন করেন ১২ লাখ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা। আর ওই সময়ের মধ্যে ইমরান উৎসব ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা ( বোনাস) উত্তোলন করেছেন ৯৬ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে ‘চাকরি না করেও’ ইমরান হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারি মোট ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ১০০ টাকা।

উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সজল মহলী শনিবার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ইমরান চাকরি না করে সরকারের টাকা ভোগ করার প্রমাণ পাওয়া গেলে ওই টাকা তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।

সজল মহলী আরও বলেন, ‘রোববার স্কুলটি পরিদর্শনে যেতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নির্দেশ দিয়েছেন।’

জানা গেছে, ডিউটি করাতো দূরের কথা ঠিকঠাক মতো হাজিরা খাতায়ও স্বাক্ষরও করেন না ইমরান। তার স্থানে কোন মতে মো. রায়হান জজ নামের এক যুবক দায়িত্ব পালন করেন। ইমরান তাকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা দেয়। ইমরানের এসব অনিয়ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষকরাও কথা বলতে সাহস পাননা লাঞ্ছিত হয়ে সম্মান হারানোর ভয়ে। কেউ কোন কথা বললে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এমনকি প্রতিবাদকারীকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে দপ্তরি ইমরানের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও এলাকায় প্রভাব বিস্তার, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও প্রতিপক্ষকে মারধরসহ নানা অভিযোগ রয়েছে ইমরানের বিরুদ্ধে। তিনি মোড়েলগঞ্জ থানার অন্তত ছয়টি মামলার আসামি বলে জানা গেছে।

তবে ইমরান ঢাকা টাইমসের কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার বদলে বর্তমানে স্কুলে বদলি ডিউটি করা রায়হানের চাচা মো. ইলিয়াস জজ জানান, ‘গত এক বছর ধরে রায়হান ৯৭ নম্বর একরামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইমরান খানের বদলে ডিউটি করে আসছে। এখনও বদলি ডিউটি করছে। রায়হানকে প্রতি মাসে ইমরান তিন হাজার টাকা দেয়।’

ইমরানের বদলে ডিউটি করা আরেক ব্যক্তি হচ্ছেন আমিনুল ইসলাম। তিনি শনিবার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি আড়াই বছর ইমরান খানের বদলে স্কুলে দপ্তরির ডিউটি করেছি। বিনিময়ে প্রতি মাসে সে (ইমরান) আমাকে আড়াই হাজার টাকা দিত।’

গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ৯৭ নম্বর একরামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন কুমার ও সহকারী শিক্ষক নিয়াজ পারভেজ দায়িত্ব পালন করছেন। দপ্তরি ইমরানের বিষয়ে জানতে চাইলে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন কুমার বলেন, ‘বাজারে গেছে’। মুহূর্তেই কথা বদলে বলেন, ‘মোরেলগঞ্জ ব্যাংকে গেছে’। দপ্তরির হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া দেখানো যাবে না বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

পরবর্তীতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার সজল মহলীকে বিষয়টি মুঠোফোনে জানালে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন কুমারকে হাজিরা খাতা দেখানোর নির্দেশ দেন। হাজিরা খাতায় দেখা যায়, দপ্তরি মো. ইমরান খান সর্বশেষ ২৭ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষর করেছেন। পুরো অক্টোবর মাস এবং নভেম্বরের ৩ তারিখ পর্যন্ত হাজিরা খাতায় কোনো স্বাক্ষর করেননি। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের পুরো ৩০ দিন এবং অক্টোবরে ৩১ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন মর্মে প্রতিবেদন দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ১৪ হাজার ৪৫০ টাকা বেতন প্রদানের জন্য সুপারিশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন কুমার।

বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ইমরান কখনই বিদ্যালয়ে আসেন না। ইমরানের পরিবর্তে স্থানীয় মো. রায়হান জজ নামের এক যুবক দায়িত্ব পালন করেন।

বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, ‘আমাদের দপ্তরি তো মো. রায়হান জজ ভাই। ইমরানতো আমাদের দপ্তরি না।’ চতুর্থ শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বলে, ‘রায়হান ভাই আমাদের ঘণ্টা দেয়, সব কাজ সে করে।’

চান মিয়া শিকদার নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়ে যখন ভর্তি হইছে, তখন তো দেখছি সব কাজ রায়হান জজ করেছে। রায়হানইতো স্কুলে দায়িত্ব পালন করেন। ইমরান তো বিভিন্ন জায়গায় রাজনীতি করে বেড়ায়। স্থানীয় অনেকে জানেই না যে ইমরান খান এখানের দপ্তরি।

বিদ্যালয় সংক্রান্ত কাগজপত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি মোরেলগঞ্জ উপজেলার চন্দনতলা গ্রামের মো. ইউসুফ আলী খানের ছেলে মো. ইমরান খান ৯৭ নম্বর একরামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর স্থানীয় মো. আমিনুল ইসলাম নামে এক যুবক মাসিক ২৫০০ টাকা বেতনে ইমরানের বদলি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে মো. রাসেল স্বর্ণমদ মাসিক চার হাজার টাকা বেতনে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে স্থানীয় মো. রায়হান জজ দায়িত্ব পালন করছেন।

বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক গোপাল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘২০১৫ সালের পরে আমি দুই বছর দায়িত্বে ছিলাম। এই সময়ে ইমরান কখনও দায়িত্ব পালন করেনি। তাকে দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ করায় আমাকে লাঞ্চিত হতে হয়েছে।’

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মো. সোহাগ বলেন, ‘ঝড়-বন্যাসহ বড় ধরনের বিপদ-আপদে ইমরানকে ফোন করলেও স্কুলে না এসে তার বদলে অন্য লোক পাঠিয়ে দিত।’

এসব বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন কুমার বলেন, ‘হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু সে (ইমরন) স্বাক্ষর দেয়নি।’ স্বাক্ষর ছাড়াই কেন পূর্ণাঙ্গ বেতন পাওয়ার প্রতিবেদন প্রদান করেছেন, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেননি নিরঞ্জন।

এ বিষয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. জাহিদ বলন, ‘এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।’

শনিবার ঢাকা টাইমসের কছে ইমরান দাবি করেন, ‘তিনি স্কুলে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন এবং নিয়মিত হাজিরা খাতায়ও স্বাক্ষর করেন।’ আর ইমরানের বাবা ওই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মো. ইউসুফ আলী খান বলেন, ‘এসব অনিয়ম আমরা বুঝি। ইউএনওর (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) উপরে আদালত রয়েছে। আদালতের উপরে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট রয়েছে। আমরা সেখানে বুঝব।’

এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. শাহ আলম বলেন, ‘সঠিক তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।’

এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সজল মহলী শনিবার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রবিবার স্কুলটি পরিদর্শনে যাবো।’ তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। দপ্তরি ইমরানের হাজিরা খাতায় সই না করার বিষয়টি প্রধান শিক্ষক স্বীকার করেছেন। এর দায়ও তিনি নিচ্ছেন। ইমরানের বিষয়ে গাফিলতি প্রধান শিক্ষকের। স্কুল পরিদর্শন করে সত্যতা পেলে প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরি ইমরানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০৫নভেম্বর/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :