বিশ্বে কমলেও, ধান উৎপাদন বাড়ছে বাংলাদেশে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৯, ২০:৫৫ | প্রকাশিত : ০৩ জুলাই ২০১৯, ১৭:০৫
ছবি: সাইফুল ইসলাম
  • উৎপাদনে চতুর্থ, রপ্তানিতে শূন্য
  • ফলনে বাম্পার, তবুও লোকসান কৃষকের
  • ধান-চাল সংগ্রহে জটিলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

সাম্প্রতিক সময়ে ধান উৎপাদনে বিশ্বে বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধি কমলেও ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। আর এ প্রবৃদ্ধি  ভারত ও চীনকেও ছাড়িয়েছে। বেড়েছে ধানের বাণিজ্য, তবে হতাশার দিকও আছে। কৃষকের দুঃখ এখনো সবচে বড়। আক্ষেপ আছে নতুন কিছু স্বয়ংক্রিয় কৃষিপ্রযুক্তি ও শীতসহনীয় ধানের জাত উদ্ভাবন না হওয়ায়।

২০১৮ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে অন্যতম ধান উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডে কমলেও ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ। ধান উৎপাদনে বিশ্বের দুই বড় দেশ ভারত ও চীনের চেয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল দ্বিগুণেরও বেশি।

বাংলাদশে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট অঞ্চল, মৌসুম ভেদে যে নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে সেটা সাফল্যের কারণ। হাইব্রিড ৬টিসহ মোট ৯৫টি নতুন ধানের জাত আবিষ্কার করে ধান গবেষণা কেন্দ্র।

শুধু ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নয়; বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আবহাওয়া ও অঞ্চলভেদে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত আবিষ্কারে কাজ করছে। পাঁচ দশকে শতাধিক ধানের জাত উদ্ভাবন হলেও এখনো শীতকালীন উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে হিমশিম খাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। কৃষিকে সহজ করতে আছে নতুন নতুন যন্ত্রপাতির চ্যালেঞ্জও।

সাফল্যের উল্টো চিত্রও আছে মাঠে। মানিকগঞ্জের নজরুল ইসলাম নুরু। বয়স সত্তরের বেশি। বংশপরম্পরায় কৃষক। কিন্তু জৌলুশ হারিয়েছেন কৃষিতে। একসময় গোলা ভরা ধান থাকত এখন বছরের খাবার জোটানোই দুষ্কর। চাষের জমি কমতে কমতে শেষ পর্যায়ে। কিছু আবাদ করলেও চোখে দুনিয়ার হতাশা।

একই গ্রামের কৃষক সোহরাব হোসেন বিল্লাল। চাষের শ্রমিক যোগাড় করতে না পেরে নিজেই বুনছেন ধান। কোথায় যেন উৎসাহে ভাটা পড়েছে। দিন দিন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ধানের কৃষকেরা। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কৃষকরা মনে করেন তারা অবহেলিত। যা ভবিষ্যতের চাষের জন্য হুমকি।

উচ্চ উৎপাদন সত্ত্বেও চাল রপ্তানিতে যেতে পারেনি বাংলাদেশ

গেল কয়েক বছরে চাহিদার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হলেও এখনো চাল রপ্তানিতে যেতে পারেনি বাংলাদেশ। বাম্পার ফলনে খুশির বদলে লোকসানে দেশের কৃষকের মুখ বেজাড়। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে জটিলতা, মিল মালিক ও  মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অস্থিরতা কৃষকদের মাঝে।

এখন উৎপাদিত ধানের ৫০ ভাগের বেশি বোরো, ৪০ ভাগের উপরে আমন বাকিটা আউশ মৌসুমে পাওয়া যায়। সত্তর দশকের শেষে এই চিত্রটা ছিল উল্টো। ৫৮ ভাগ আমন, ২৩ ভাগ আউস এবং ১৯ ভাগ বোরো থেকে আসতো। ১৯৭১-৭২ সালে ধানের উৎপাদন ছিল ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বর্তমানে হয় ৩৬ মিলিয়ন।

ধানে ধারাবাহিক বাম্পার ফলন হচ্ছে। আমনের পর বোরো মৌসুমেও এবার উৎপাদন বেড়েছে। ফলন দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেও তা দ্রুত মিলিয়ে যায়। কারণ বাজারে ধানের দাম কম, গড়ে মণ প্রতি ৪০০-৫৫০ টাকা, যা খরচের অর্ধেক। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের তথ্যমতে ধানে কেজি প্রতি এখন উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ টাকা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এ বছর ধান কাটায় মাঠে ছিল হাহাকার। ধানের কদর বাজারে কম কিন্তু ধান কাটাার শ্রমিকের মূল্য আকাশ ছোঁয়া। মৌসুমি এসব শ্রমিকের আছে নিজস্ব ব্যাখ্যা। মহাজনদের ঋণের চাপ থাকে কৃষকের ঘাড়ে। তড়িঘড়ি করে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকদের অর্ধেক দামে বেচতে হয় ধান। দাম কম হওয়ার পেছনে মজুদদার ও মিল মালিকদের কারসাজি দেখেন কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা। আর মিল মালিকরা দুষছেন ধান সংগ্রহে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে।

কৃষকের জন্য সংকট পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আবাদি জমি থাকলেও ফসল থাকবেনা একসময় মাঠেÑ এমন শংকা সংশ্লিষ্টদের। কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে বাস্তবমুখী কর্মসূচি হাতে নেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন  বিশেষজ্ঞরা।

বাম্পার ফলনেও খুশির বদলে লোকসানে কৃষক

ধানের ক্রমবর্ধমান উদ্বৃত্ত উৎপাদনে সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চাল রপ্তানী করতে চায়। এজন্য কৃষি যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন, নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষককে প্রনোদনা দেয়ো সহ, নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্টরা। গবেষকরা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে জোড় দিচ্ছেন।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। কিন্তু বিশ্বে চালের বাজার নিয়ন্ত্রকারী পাঁচ দেশের তালিকায় নেই। আছে ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও মিয়ানমার। বিশ্ববাজারে প্রবেশ কঠিন হরেও অদূর ভবিষ্যতে চাল রপ্তানীতে আগ্রহী সরকার। তাই সম্প্রতি চাল আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধিকে ইতিবাচক বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

৯০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশী আছে বিভিন্ন দেশে। মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ-আফ্রিকাতে দেশের ছোট ও সুগন্ধি চালের কদর রয়েছে। এ ছাড়াও পুষ্টিহীনতা রোধে নতুন নতুন ধানের আবিষ্কার করছে গবেষকরা।

সনাতন পদ্ধতির চাষ বিলুপ্ত অনেক আগেই। তবু ভবিষ্যতের  চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎপাদন খরচ কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

৭০ শতাংশ কৃষক বছরে এক থেকে দুটি ফসল উৎপাদন করছে। সাফল্যকে টেকসই করতে ফসলের এ সংখ্যা ও কৃষকদের সহযোগীতা বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন গবেষক, কৃষি বিজ্ঞানীরা।

ঢাকাটাইমস/০৩জুলাই/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :