সাংবাদিকতা ছেড়ে উদ্যোক্তা

তিতলির ডে-কেয়ার এখন মায়েদের ভরসা

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ১৬:৩৯ | প্রকাশিত : ০৮ মার্চ ২০২২, ১০:১৮

একসময় যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতায়। মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো সৈয়দা আশরাফুন নাহার (তিতলি) ২০০৫ সাল থেকে দেশের প্রথিতযশা ৩টি টিভি চ্যানেলে কাজ করেন। সাংবাদিকতার নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার মাঝেই ২০১৫ সালে প্রথম সন্তান মেঘমালার সুখবর পান। অনাগত সন্তানকে পেটে নিয়েই কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসা করেন। কিন্তু রাস্তায় গাড়ির ঝাঁকিতে মেমব্রেন লিকেজ হওয়ায় চলে যান আগাম ছুটিতে। অবশেষে পৃথিবীর আলো দেখলেও ওজন কম ও প্রিম্যাচিউর হয়ে জন্ম হয় মেঘমালার। সন্তানের নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হলেও তখন অফিসে ছুটি মেলেনি। তাই সন্তানের কথা ভেবে তিতলি ইতি টানেন প্রিয় পেশার।

সময়ের পরিক্রমায় শিশু সন্তানদের নিয়ে নানা ধরনের কাজ করেছেন তিতলি। অনুভব করেছেন কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের বড় করতে পরিশ্রমের কথা। অনেকে ইচ্ছা-সুযোগ থাকার পরও সন্তানের কথা চিন্তা করে কাজে যুক্ত হতে পারেন না। তাই এমন মায়েদের একদণ্ড স্বস্তি দিতে তার মাথায় আসে ডে-কেয়ার সেন্টার করার।

যেই ইচ্ছা সেই কাজ। ২০১৯ সালের ২৮ জুন আলোর মুখ দেখে তিতলির স্বপ্ন। মিরপুরের পল্লবীতে ‘কেয়ার ফর চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট’ (সিসিডি) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে (১/১, অ্যাটিভো, প্রেস্টিজ, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা)।

বাহুল্যবর্জিত অন্দরসজ্জা, চারপাশ খোলামেলা, প্রচুর আলো বাতাস এবং আনন্দময় এক আবহ নিয়ে শিশুদের জন্য তৈরি করা হয় সিসিডি। দিনে দিনে শিশুদের স্বস্তির জায়গার পাশাপাশি বাবা-মায়েদের ভরসার জায়গায় পরিণত হয়েছে সিসিডি।

সিসিডির মূল কাজ শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর বিভিন্ন ধরনের বিকাশে সাহায্য করা। এজন্য ১২ ঘণ্টা কেয়ারের পাশাপাশি বয়স ধরে নানামুখী কার্যক্রম করা হয়। সিসিডি প্রি-স্কুলে খেলার মাধ্যমে পড়ালেখা শেখানো হয়।

ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে সম্প্রতি পর্যটন নগরী কক্সবাজারে নতুন একটি শাখা চালু করেছেন তিতলি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিওর দেশি-বিদেশি বাবা-মায়ের সন্তানদের ভালো পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিতেই এমন চিন্তা বলে জানিয়েছেন সিসিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আশরাফুন নাহার।

যেভাবে ডে-কেয়ার শুরুর পরিকল্পনা প্রথম সন্তান মেঘমালাকে লালন পালনের ফাঁকে টেলিভিশনে খবর দেখার সময় সাংবাদিকতা পেশার দুর্দান্ত জীবনকে মিস করতেন তিতলি। কিন্তু মেয়েকে রেখে ছেড়ে আসা পেশায় আর ফেরার সুযোগ হচ্ছিল না। মানসিকভাবেও কিছুটা বিষণ্ণ ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে সিসিমপুরের একটা প্রজেক্টে কাজের সুযোগ এসে যায়। তখন মাঠ পর্যায়ে কাজের চাপ বেশি হওয়ায় অফিস আর সন্তান সামলাতে হিমশিম খান এই উদ্যোক্তা। তখন স্বামী-স্ত্রী দিন রাত ভাগ করে বাচ্চার দেখভাল শুরু করেন তিতলি-শিহাব দম্পতি। কিন্তু এতে বাচ্চার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।

পরে ফেসবুকে কিছু ডে-কেয়ারের খোঁজ পান তিতলি। কিন্তু যেমন পরিবেশ চান প্রতিষ্ঠানগুলো সেরকম ছিল না। এসময় নিজের পাশাপাশি অন্য কর্মজীবী মায়েদের দুরবস্থার কথা অনুভব করে ডে-কেয়ার সেক্টরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। শিশু বিকাশ নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন একজনের সঙ্গে পার্টনারশিপে কাজ শুরু করে দেন। কথা বলেন লিগ্যাল অ্যাডভাইজারের সঙ্গে।

‘নিজের এলাকা ছাড়াও অন্যান্য এলাকার ডে-কেয়ারগুলোর খোঁজ নেই। ইন্টারনেটে এ নিয়ে পড়াশোনা করি। এক্ষেত্রে সিসিমপুর প্রজেক্টে প্রায় পাঁচ হাজার শিশুর সঙ্গে আমার সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা এবং সিসিমপুরের দেয়া প্রশিক্ষণ খুব কাজে আসে। আশীর্বাদ হয়ে পাশে দাঁড়ায় নিজের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা। ১২ ঘণ্টা কেয়ারের পাশাপাশি বয়স ধরে নানামুখী কার্যক্রম আছে সিসিডিতে। এখানে প্রি-স্কুলে খেলার মাধ্যমে পড়ালেখাও শেখানো হয়।’ বলেন তিতলি।

যেমন চলছে সিসিডি

সিসিডি প্রতিষ্ঠার শুরুতে আশানুরূপ সাড়া মেলে। প্রথম ছয় মাসে ২৪ শিশু ভর্তি হয়। ঢাকার উত্তরাতে দ্বিতীয় শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর আগেই করোনার ধকলে বন্ধ করে দিতে হয়। করোনায় লকডাউন শুরু হলে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে তিতলির। পরে সব কিছু স্বাভাবিক হলে সিসিডি আস্তে ঘুরে দাঁড়ায়। বর্তমানে ১৮ শিশু প্রতিদিনে এখানে সময় কাটায়।

ডে-কেয়ার ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা কী?

ডে-কেয়ার ব্যবসার বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, ক্লায়েন্টের মানসিকতা। সরকারি ডে-কেয়ারে সরকারের সহযোগিতা থাকে। এজন্য তার মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু ব্যক্তি উদ্যোগে ডে- কেয়ার গড়ে তুলতে প্রতিটা ক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে হয়। যেমন- সহজে বাড়িভাড়া পাওয়া যায় না, শুরুতে কোনো ব্যাংক লোন দিতে চায় না। উচ্চ শিক্ষিত মেয়েরা এই পেশায় নিজের ক্যারিয়ার গড়তে এখনও ততটা আগ্রহী নয়। দক্ষ কেয়ারগিভারেরও সংকট রয়েছে। এছাড়াও ডে-কেয়ার সংস্কৃতি দেশে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। অভিভাবকদেরও ধারণা খুব একটা ইতিবাচক নয়। শিশুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরির ভয়ও আছে বলে মনে করেন তিতলি।

নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আলাদা সুবিধা নয়, তবে ডে-কেয়ারের অভিভাবকরা একজন নারী পরিচালকের অধীনে সন্তানদের রাখতে স্বস্তি বোধ করেন সিসিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

এই উদ্যোক্তার মতে, ডে-কেয়ার খাতে সম্ভাবনা প্রচুর। তবে এখনকার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অনেক টাকার বিনিয়োগ লাগলেও ব্যবসার ধরন মুনাফাভিত্তিক না হওয়ায় খরচ তুলে আনাই কঠিন।

করোনার কারণে সবখাতের মতো ডে-কেয়ার খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সিসিডি দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেব সম্প্রতি সিসিডি কক্সবাজারের বাহারছড়াতে দ্বিতীয় শাখার (৩০৪, ল্যাবরেটরি স্কুল রোড, মধ্যম বাহারছড়া, কক্সবাজার) কার্যক্রম শুরু করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করছে এমন অনেক দেশি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রচুর মা। শিশুকে রেখে তাদের জন্য ফিল্ড ওয়ার্ক করা ভীষণ কষ্টকর। মূলত তাদের অনুরোধে কক্সবাজারে শাখার কাজ শুরু করা হয়।

উন্নত বিশ্বে সরকার ডে-কেয়ারকে বিশেষভাবে সহায়তা করলেও দেশে ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত ডে কেয়ার কোনো ধরনের সরকারি সুবিধার আওতায় এখনও আসে নি। প্রাতিষ্ঠানিক সেবার খরচেরর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সিসিডি তার বেতন নির্ধারণ করে।

আগামী দিনে দেশের সব জেলায় সিসিডির শাখা খুলতে চান- এমনটা জানিয়ে সৈয়দা আশরাফুন নাহার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমার ইচ্ছা কোনো নারীকে তার অনিচ্ছায় সন্তানের জন্য যেন ক্যারিয়ার ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে না হয়। শিশুর জন্য একটা স্বাভাবিক শৈশবের পরিবেশ গড়ে দিতে চাই যাতে তাদের সামগ্রিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। সবাইকে দেখাতে চাই মাতৃত্ব নারীর দুর্বলতা নয়, শক্তি।’

(ঢাকাটাইমস/০৮মার্চ/বিইউ/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :