সামরিক শক্তি বাড়ছে মিয়ানমারের, সরবরাহ করছে কারা?

ঢাকা টাইমস ডেস্ক
| আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:৪৭ | প্রকাশিত : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২৩:২৮

মিয়ানমারের ক্ষমতা সামরিক শাসক দখলে নেওয়ার পর থেকেই দেশটিতে চলছে দমন-নিপীড়ন। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার বহু সংবাদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সম্প্রতি দেশটিতে জনগণের ওপর চালানো নির্যাতন কমিয়ে আনার উদ্দেশে সদস্যদেশগুলোকে মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বানও জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন।

সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মিদের দমাতে লড়াই করছে সরকার। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই রাজ্যের লড়াইয়ের প্রভাবে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে দেশেও। মিয়ানমারের ছোড়া গোলাতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশ সীমান্তে। ক্রমেই সামরিক সামর্থ্য বাড়িয়ে চলেছে মিয়ানমার। সামরিক শক্তির দিক থেকে মিয়ানমার তার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের থেকেও দেশটির অবস্থান শক্তিশালী।

অং সান সুচির রাজনৈতিক দল এনএলডি নির্বাচনে বিজয়ের পর ক্ষমতায় তাদের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর ঠিক আগে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করে। ওই সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। ফলে মিয়ানমার এক রকম বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটির সামরিক সামর্থ্য কমেনি বা তাদের সমরাস্ত্র কেনা থেমে নেই।

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার নামক একটি সংস্থা ২০২২ সালের সামরিক শক্তিধর দেশগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় থাকা ১৪২ টি দেশের মধ্যে মিয়ানমারের অবস্থান ৩৯ তম, আর বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬ তম।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তির দিক থেকে ১৮তম অবস্থানে আছে মিয়ানমার। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স অনুসারে, ২০২২ সালে প্রতিরক্ষা খাতে মিয়ানমারের বরাদ্দ সাড়ে ২২৮ কোটি মার্কিন ডলার, সেনাবাহিনীর সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে চার লাখ এবং প্যারামিলিটারির সংখ্যা আনুমানিক ৫০ হাজার।

আকাশপথে শক্তির দিকে দেশটির রয়েছে, ২৮০টি বিমানের বহর যার মধ্যে ফাইটার বা ইন্টারসেপ্টর এয়ারক্রাফট ৫৫টি রয়েছে। প্রশিক্ষণ বিমান ৯৩টি এবং আক্রমণ চালানোর জন্য সংরক্ষিত বিমানের সংখ্যা ২১টি। এছাড়া যুদ্ধ বিমান পরিবাহী যানের সংখ্যা ২৬টি, হেলিকপ্টার আছে ৮০টি এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টারের সংখ্যা ৯টি।

সামরিক যানের মধ্যে মোট ট্যাংক আছে ৬৬৪টি, সাঁজোয়া যান ১৫৮৭টি, কামানের সংখ্যা ১৯০টি, টানা কামান আছে ১৮৬৯টি, রকেট প্রজেক্টর ৪৮৬টি, যুদ্ধবহরে নৌযান মোট ১৫৫টি। এর মধ্যে ফ্রিগেট আছে পাঁচটি, ছোট যুদ্ধ জাহাজ কর্ভেটস তিনটি এবং টহল জাহাজের সংখ্যা ১৩৩টি। এছাড়াও দেশটির একটি সাবমেরিন এবং দুইটিমাইন ওয়ারফেয়ার ক্রাফট আছে। জনগণের ওপর নজরদারি করার জন্য ইসরায়েলের কাছ থেকে পেগাসাস সফটওয়্যারও কিনেছে মিয়ানমার যা দিয়ে মোবাইল ফোন হ্যাক করে গোপনে নজরদারি চালানো যায় যেকোন ব্যক্তির ওপর।

২০১৯ সালে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন টিম মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছিল। সেসময় ওই টিমের দেয়া রিপোর্টে মিয়ানমারের কাছে কোন কোন দেশ অস্ত্র বিক্রি করে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারত, চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ফিলিপাইনস, ইসরায়েল এবং ইউক্রেন, এই সাতটি দেশের কয়েকটি কোম্পানি মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবারহ করেছে।

সমর বিশেষজ্ঞ এবং কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেছেন, প্রতিবেশী দুই দেশ চীন এবং ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার কারণে দেশটির সমরাস্ত্রের বড় অংশটি তারা এই দুইটি দেশ থেকে কেনে। চীন এবং ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে যখন প্রথম দফায় দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেতা অং সান সুচিকে গৃহবন্দি করা হয়, সেসময় পশ্চিমা দেশগুলো যখন তৎকালীন বার্মার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, ওই সময়ও চীন ও ভারত দেশটিকে সমর্থন যুগিয়েছে। সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে মিয়ানমারকে একটি রুশ নির্মিত সাবমেরিন উপহার দিয়েছে ভারত।

তবে, ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চীন, রাশিয়া, ভারত, ইসরাইল এবং ইউক্রেন ছিল মিয়ানমারের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। মিয়ানমারের বেশিরভাগ ফাইটার বিমান, সাঁজোয়া যান, বন্দুক এবং যুদ্ধজাহাজ আসে চীন থেকে। আর যুদ্ধবিমান সরবরাহকারী দেশের মধ্যে রাশিয়া প্রধান। এছাড়া রাশিয়া মিয়ানমারের কাছে সাঁজোয়া যানও বিক্রি করছে। এছাড়া রকেট এবং কামানের গোলার প্রধান সরবারহ আসে সার্বিয়া থেকে।

সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত ২০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তির অধীনে ছয়টি ফাইটার জেট পাওয়ার কথা মিয়ানমারের। ছয়টির মধ্যে দুইটি জেট চলতি বছরের মার্চে ডেলিভারি পেয়েছিল মিয়ানমার। বাকি চারটি শীঘ্রই দেশটির জান্তা সরকারের কাছে পৌঁছে যাবে বলে জানিয়েছে ব্যাংকক ভিত্তিক মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম ইরাবতী।

ইরাবতীর প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া রাশিয়া শীঘ্রই নতুন সুখোই এসইউ-৩০এসএম জেট ফাইটার সরবরাহ করবে সামরিক সরকারের কাছে। সম্প্রতি দেশটিতে ব্যাপক আকারে হামলা চালাচ্ছে জান্তা সরকার। এতে শিশুসহ অনেক বেসামরিক নিহত এবং অনেক আহত হচ্ছে। নতুন চারটি যুদ্ধ বিমান পেলে সরকারের তাণ্ডব আরও বেড়ে যাবে।

জান্তার মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুন মঙ্গলবার বলেছিলেন, অভ্যুত্থান নেতা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং এই মাসে রাশিয়া সফরের সময় ইরকুস্টস্ক এভিয়েশন প্ল্যান্টে বিমানের উৎপাদন ও পরীক্ষা ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শন করেছেন। বিমানগুলো শীঘ্রই পাঠানো হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।’

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সামরিক হার্ডওয়্যারের পৃষ্ঠপোষক। মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা দখলের পর থেকে তিনবার রাশিয়া সফর করেছেন এবং রাশিয়ান অস্ত্রের একজন অনুরাগী হিসেবে সেগুলোর প্রতি দুর্বলতার কথা জানিয়েছেন। স্টকহোমের ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিটের মতে, মিয়ানমারের কাছে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৪৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে রাশিয়া।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যে হার্ডওয়্যারগুলো কিনেছে তার মধ্যে রয়েছে মিগ-২৯ ফাইটার জেট, ইয়াক-১৩০ কমব্যাট প্রশিক্ষক, এমআই-১৭, এমআই-২৪ এবং এমআই-৩৫ কমব্যাট হেলিকপ্টারসহ অন্যান্য অস্ত্র।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য মতে ২০২২ সালের প্রথম তিন মাসে দক্ষিণ-পূর্ব মায়ানমারের কায়াহ এবং কারেন রাজ্যের গ্রাম এবং একটি শরণার্থী শিবিরে আটটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় নয়জন বেসামরিক লোক নিহত এবং কমপক্ষে নয়জন আহত হয়েছে। এছাড়াও বাড়িঘর এবং ধর্মীয় ভবন ধ্বংস হয়েছে।

ইরাবতী জানায়, স্থল যুদ্ধে সরকারের সেনারা পদে পদে পরাজয় এবং দলত্যাগের শিকার হচ্ছে। এমনকি পশ্চিম মায়ানমারে আরাকান আর্মির মতো জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধেও বিমান হামলা চালাচ্ছে সরকার। উল্টো এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করতে লড়াই করছে জান্তা সরকারকে। এ কারণেই সরকার আকাশ পথে হামলার দিকে ঝুঁকছে।

(ঢাকাটাইমস/২০সেপ্টেম্বর/এসএটি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :