‘আত্মঘাতী’ হচ্ছে জঙ্গিরা, ছড়াচ্ছে উদ্বেগ

আউয়াল খাঁন
ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৭, ১২:৫৩ | প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৭, ০৮:৪৭

গুপ্তহত্যা বা অতর্কিত হামলার পর এবার জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের আত্মঘাতী হয়ে উঠার প্রবণতা স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও এই প্রবণতা শুরু হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করণীয় কী-সে বিষয়ে এ বিষয়ে মতামত দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও।

বাংলাদেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা চললেও আত্মঘাতী হয়ে উঠার প্রবণতা খুব একটা দেখা যায়নি। তবে ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর থেকেই পুলিশের অভিযানে নানা এলাকায় ‘আত্মঘাতী ‘জঙ্গি’ আটকের তথ্য জানা যায়। এই প্রবণতায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও আছেন।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ইতিহাসে আত্মঘাতী হামলার প্রথম নমুনা দেখা যায় গত ডিসেম্বরে আশকোনায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানের দিন। ২৪ ডিসেম্বর ওই আস্তানার ভেতরে থাকা এক নারী আত্মসমর্পণের ভান করে বের হয়ে এসে নিজের গায়ে থাকা বোমার বিস্ফোরণে প্রাণ হারান।

এর পর কয়েক মাস আবার এই ‘আত্মঘাতী’দের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সন্দেহভাজন দুটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে আবারও ‘আত্মঘাতী জঙ্গি’র প্রসঙ্গ আসে।

বুধবার সীতাকুণ্ডের সাধন কুঠির থেকে আটক করা হয় এক নারী ও এক পুরুষকে। এদের মধ্যে ওই নারীর কোমরে বোমা বাঁধা ছিল। পুলিশ বলছে, আটকের আগে ওই নারী বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করলেও একজন সময় মত তার দুই হাত ধরে ফেলায় তিনি সক্ষম হননি।

এই দুইজনের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে পাশের ছায়ানীড় ভবনে অভিযানে যায় পুলিশ। প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখার পর ওই বাড়িতে ঢুকে পুলিশ। এ সময় ভেতর থেকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নিহত হয় চার জন। আর পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় আরও একজন।

এই ঘটনার পরদিনই ঢাকার আশকোনায় র‌্যাবের নির্মাণাধীন সদরদপ্তরে ঢুকে নিজের গায়ে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রাণ দেন সন্দেহভাজন এক জঙ্গি। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করে তাদের সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছে।

জঙ্গিদের এভাবে নিজের প্রাণ দিয়ে নাশকতার চেষ্টায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে। তবে এ নিয়ে প্রকাশ্যে তারা কিছু বলতে চাইছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, কেউ নিজে মরে গিয়ে নাশকতার চেষ্টা করলে তাকে ঠেকানো কঠিন।’

অন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছেও উদ্বেগজনগ তথ্য আছে। এর সব প্রকাশ করা কঠিন।’

জঙ্গিদের আত্মঘাতী হয়ে উঠার প্রবণতা ঠেকাতে পুলিশের বক্তব্য জানতে চাইলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষ শাখা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউটিনের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবে না। আপনি অন্য কাউকে ফোন দেন।’

এছাড়াও নানা সময় নানা নামে বাংলাদেশে তৎপরতা চালিয়েছে জঙ্গিরা। ২০০৫ সালে সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে অস্তিত্ব জানান নেয় জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-জেএমবি। এক কিছুদিন পর নেত্রকোণায় একটি বিস্ফোরণে বেশ কজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে যা আত্মঘাতী হামলা বলে ধারণা করা হয়। এরপর গত প্রায় এক যুগে দেশে প্রথমবারের মতো আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটলো।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ মনে করেন, জঙ্গিদের এই আত্মঘাতী হয়ে উঠা এটা প্রমাণ করে যে তারা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশে জঙ্গিরা চাপের মুখে আছে। তারা এখন টিকে থাকার জন্য এই হামলা করছে।’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরা সবশেষ হামলা করেছে র‌্যাবের উপর। তারা এটাও জানে পুলিশের একটি এলিট ব্যাটালিয়ন হচ্ছে র‌্যাব। তাদের উপর হামলা করলে সারা বিশ্বে এর প্রচার পাওয়া যাবে।’

আবদুর রশিদ মনে করেন, জঙ্গিদের সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হয়ে উঠা উদ্বেগজনক হলেও এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনও পাকিস্তান, সিরিয়া কিংবা আফগানিস্তানের মত হয়ে যায়নি। কারণ দেশের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সরকারের উপর আছে, জঙ্গিদের নয়।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আত্মঘাতীর হামলার প্রবণতা আগেও ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গিরা এখন কোণঠাসা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়ার কারণে জঙ্গিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই তারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আত্মঘাতী হামলা করছে।’

এসব হামলা এখন পর্যন্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। বেসামরিক জনগণও তো হামলার স্বীকার হতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মারজান বলেন, ‘এর জন্য সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখা দিয়ে আসছে। এর বিরুদ্ধে দেশের ইমাম মাশায়েখদের নিয়ে কোরআনের ভালো আয়াতের ব্যাখা করতে হবে। যেসব জঙ্গি দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছে তাদেরকে সাইকোলজিকাল কাউন্সিলিং দেয়া প্রয়োজন। কাউন্সেলিং না দেয়ায় তাদের মধ্যে অন্য জঙ্গি মতাদর্শ থেকে যাওয়ার সুযোগ থাকে।’

জঙ্গি সংগঠনগুলো যেন লোকবল সংগ্রহ করতে না পারে, সে জন্য জনগণের মধ্যে জঙ্গিবিরোধী ব্যাপক প্রচার চালানোরও পরামর্শ দিয়েছেন এই দুই বিশেষজ্ঞ। তারা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ প্রাকৃতিকভাবে কঠোর প্রকৃতির নয়। ফলে উগ্রবাদ এখানে কখনও বিকশিত হয়নি। এখন এই ধরনের চেষ্টা চললেও সমন্বিত চেষ্টা চলছে তারা বিকশিত হতে পারবে না।

(ঢাকাটাইমস/১৮মার্চ/এএকে/ডব্লিউবি)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত