পনেরো অক্টোবরে ঘটে যাওয়া জগন্নাথ হলের সেই ট্র্যাজেডি

বাহালুল মজনুন চুন্নূ
 | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৭, ১১:৫১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল নামের সঙ্গে ‘স্ট্রাগল’, ‘ট্র্যাজেডি’, ‘প্রাইড’ এই শব্দগুচ্ছ পাশাপাশি অবস্থান করে আসছে বহুকাল ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে তিনটি হল নিয়ে যাত্রা করেছিল জগন্নাথ হল তার একটি। এই দেশের বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের মধ্যে সামাজিক সংহতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই হলটিই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে; ইতিহাস তারই সাক্ষ্য দেয়। তাছাড়া এদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এমন কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই যেখানে এই হলের ছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল না। এই হল কালের স্বাক্ষী, ইতিহাসের স্বাক্ষী, আর স্বাক্ষী সন্তানহারা বাবা-মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস ও চোখের জলের। ঐতিহ্যবাহী এই হলেই ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঘটে গিয়েছিল এমনই ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডি যাতে প্রাণ হারিয়েছিল ঊনচল্লিশটি তরতাজা প্রাণ আর আহত হয়েছিল তিন শতাধিক মানুষ।

সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজো আমাকে এবং আমার মতো আরো অনেককে তাড়িয়ে বেড়ায়। জগন্নাথ হল এলাকায় আজ যেখানে ‘অক্টোবর স্মৃতিভবন’ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই এই ট্র্যাজেডি ঘটেছিল।

ওই স্থানটিতে এক সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসতো। একে ‘পরিষদ ভবন’ বা অ্যাসেম্বলি হল বলা হত। ভবনটি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ছাত্রদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জগন্নাথ হলের সঙ্গে যুক্ত করেন। এরপর একাত্তরের শহীদ আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের নামে এ পরিষদ ভবন বা অ্যাসেম্বলি হলের নামকরণ করা হয় ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবন’। পুরনো এই ভবনটিকে আগেই বসবাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে চুন, সুরকি, লোহার রডের বিম দিয়ে তৈরি এ ভবন ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টি হলেই ছাদ বেয়ে পানি পড়তো। কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের বিনোদন ব্যবস্থা হিসেবে এখানেই একটি বড় রঙিন টেলিভিশন স্থাপন করেছিল। কক্ষের সামনের নিচু জায়গায় রাখা ছিল টিভি। ছাত্ররা যেন বৃষ্টিতে না ভিজে যায় সেজন্য ছাদে টিন দেয়া ছিল। ঘটনার দিন সকালে ভবনটি মেরামত করার উদ্দেশ্যে ছাদ থেকে টিন সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। এতে সারাদিনের বৃষ্টিতে ছাদ নরম হয়ে যায়। আর রাতে ধসে গিয়ে সৃষ্টি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেরই কেবল নয়, জাতির ইতিহাসের করুণ এক ট্র্যাজেডির।

ওইদিন বিটিভির রাত আটটার বাংলা সংবাদের পর উদয়ন স্কুলের অধ্যক্ষ মমতাজ বেগমের লেখা জনপ্রিয় নাটক ‘শুকতারা’ দেখার জন্য ছাত্র, কর্মচারী, অতিথিরা উপচে পড়েছিল টিভি রুমে। কারণ এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিরঞ্জন অধিকারীর ছোট ভাই, সংস্কৃত বিভাগের ছাত্র মন্ময় অধিকারী। বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। সবাই তন্ময় হয়ে যখন নাটক দেখছিল  তখন ঠিক পৌনে নয়টার দিকে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ভয়ংকর শব্দে সেই টিভিরুমের ছাদ ধসে যায় তাদের মাথার উপর। নিমিষেই আনন্দঘন সেই পরিবেশে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। সৃষ্টি হয় নারকীয় অবস্থা। গগনবিদারী চিৎকারে চতুষ্পার্শ্ব পরিণত হয় রক্তমাংসের এক ধ্বংস স্তূপে। তখন সবে আমি ছাত্রলীগ ছেড়েছি। থাকতাম গ্রিন রোডে। খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের গহীন থেকে ব্যথা চিনচিন করে উঠতে লাগল। এই হলের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দুর্দিনে যখন পালিয়ে বেড়াতাম, তখন এই হল ছিল আমার এবং আরো অনেক ছাত্রলীগ কর্মীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তাই কালবিলম্ব না করে ছুটে গিয়েছিলাম সেখানে।

চারিদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। থেতলে যাওয়া মাংসস্তূপ, ছিন্নভিন্ন দেহ আর আহতদের কাতর চিৎকারে সেই রাতটিতে যে বীভৎস দৃশ্যর অবতারণা ঘটেছিল, যে ভয়াবহ নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেটা ওইরাতে যারা সেখানে উপস্থিত ছিল তাদের কাছে সেটা দু:স্মৃতি হিসেবে এখনো পীড়া দেয়। জগন্নাথ হলের দুর্ঘটনার কথা দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছিল সেখানে। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সবাই ছুটে এসেছিল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। লাশ সরানো, আহতের  উদ্ধার করে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া, রক্তদান থেকে শুরু করে যাবতীয় সেবা শুশ্রুষা দেয়ার কাজে সবাই জাত-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। বড়ূ চন্ডীদাসের ‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই’ এই কথাটিই সেদিন সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। এই জাতি যে অসাম্প্রদায়িক এক জাতি সেই কথাটি আবারো প্রমাণিত হয়েছিল সে রাতে। সেই সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছিল মানবিকতা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন লাশ সরাচ্ছিলাম তখন চোখ দিয়ে আনমনেই পানি গড়িয়ে পড়ছিল। কী তরতাজা প্রাণগুলো অকালে ঝড়ে গেল, কত স্বপ্ন, কত আশা, কত উজ্জ্বল সম্ভাবনা এক নিমিষেই বৃষ্টিভেজা মাটিতে মিশে গেল। লাশগুলো আমরা সারি করে রেখেছিলাম। সেই লাশের বীভৎস চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃত্যু কত ভয়াবহ হতে পারে তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উঠে আসা মেধাবি শিক্ষার্থীদের প্রাণ যেভাবে এক দমকা হাওয়ায় শেষ হয়ে গেল তা পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এমন দুর্ঘটনা কেন ঘটলো? কেন অকালে ঝরে গেল কতগুলো তরুণ তাজা প্রাণ? এর দায় তৎকালীন প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অনেক স্বপ্ন বুকে বুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ভবন ধসে এভাবে মেধাবি শিক্ষার্থীদের জীবন বলি দেয়াটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু ভবন বয়সের ভারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। বিশেষত সত্তর সালের আগে যেসব ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে সেগুলোই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। জগন্নাথ হলের জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা ও গোবিন্দ চন্দ্র দেব ভবন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ। সলিমুল্লাহ হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, সূর্যসেন হল, জহুরুল হক হল, শহিদুল্লাহ হলসহ বেশ কয়েকটি একাডেমিক ভবন এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।

আশার কথা বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণের সঙ্গে বিভিন্ন পুরোনো ভবনগুলোর সংস্কারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই সংস্কার কাজের গতি আরো বেগবান করা জরুরি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ঝুঁকিপূর্ণ। জগন্নাথ হলের সেই বিভীষিকাময় দু:সহ ঘটনার মতো কোনো ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি দেয়া এবং মেয়াদোত্তীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত