দুঃসময়ের কান্ডারি রবিউল ভাইয়ের জয় চাই

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
 | প্রকাশিত : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:২৫
ডানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের নৌকার প্রার্থী উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, বামে লেখক

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর)  আসন থেকে নৌকা মার্কার প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেনl এই বিশাল নামের মতই এক বিশাল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা তার পেছনে কাজ করছেl আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বিষয়টি অবগত নয়l

তবে এতো বড় নামে তাকে কেউ সম্মোধন করে নাl ব্রাম্মণবাড়িয়া তথা সারা বাংলাদেশে তিনি রবিউল ভাই নামে পরিচিতl আসলে কে এই রবিউল মুক্তাদির চৌধুরী? তিনি কোথায় থেকে কেমন করে এলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে? তাহলে ফিরে যেতে হয় সেই ছাত্র রাজনীতির শুরুতেl 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যৈষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ভাইয়ের বিশেষ ঘনিষ্ঠ সহচর মোকতাদির চৌধুরী ১৯৭০ সালে পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সব আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সম্মুখভাগে ছিলেন। ১৯৬৯-৭০ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হনl মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে আহত হন রবিউলl

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বার্ষিক সম্মেলনে মোকতাদির চৌধুরী ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত হনl ছাত্র রাজনীতির শুরুতেই তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ বক্তা ও লেখকl এখান থেকেই আমার সাথে রবিউল ভাইয়ের প্রথম পরিচয়l এই সময় আমরা ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ কমিটি ঢাকার বিভিন্ন কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকালে লিফটলেট লেখায় সহযোগিতার জন্য তার শরণাপন্ন হতামl

লেখায় তার কলমের দক্ষতা অসীমl কীভাবে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে কী লিখতে হবে তার সবকিছুই ছিল তার নখদর্পনেl

এভাবেই ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগরের নেতা ও  কর্মীদের উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেনl শেখ কামাল ভাইয়ের কাছেও ছিলেন অতি প্রিয় মানুষ্l ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মমতাজ হোসেন (সাবেক রাষ্ট্রদূত) ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুল ইসলাম (১৯৭২) দুইজনই ছিলেন তার খুব প্রিয় সঙ্গীl পরে সৈয়দ নুরুল ইসলাম নুরু ভাই সভাপতি হলে (১৯৭৩-৭৪) আমি, রউফ ও ইউনুস একই কমিটিতে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আমাদের চারজনের সাথে রবিউল ভাইয়ের সম্পর্কটা আরো গাঢ় হয়l

কারণ আমরা চারজনই ছিলাম কামাল ভাইয়ের খুবই কাছের ও প্রিয়l ফলে রবিউল ভাইয়ের সাথে আমাদের যোগাযোগটা ছিল একটু বেশিl আমাদের প্রতি তার সহযোগিতার হাত ছিল সবসময়l

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করলে ঢাকা মহানগর জাতীয় ছাত্রলীগের ১৩ সদস্যের আহবায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে আমি ও রউফ ঢাকা মহানগরের সকল কলেজ সংগঠনগুলো তদারকির দায়িত্ব পেয়েছিলামl এই কমিটিতে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে আসা খন্দকার শওকত জুলিয়াসও (অবসরপ্রাপ্ত সচিব) আমাদের সাথে ছিলেনl

আমি, রউফ ও জুলিয়াস এই তিজন কাকরাইলে অবস্থিত জাতীয় ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগরের কার্যালয়ে রবিউল ভাইয়ের সাথে লিফটলেট লেখা নিয়ে বার বার সহযোগিতা পেয়েছি l এই সময় জাতীয় ছাত্রলীগের ২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগ, যুব লীগ ও  ছাত্রলীগ কর্মীদের উপরে নেমে আসে এক বিশাল অন্ধকারl সৈয়দ নুরুল ইসলাম, রউফ শিকদার ও মোহাম্মদ ইউনুস কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পাহাড়ের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাতে ঢাকা শহর ছাত্রলীগের আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে আমার উপর একটা বিরাট দায়িত্ব এসে পরেl এই দুঃসময়ে যারা জীবনের ঝুঁকি কি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে গোপন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তারা হলেন ওবায়দুল কাদের, রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ ম জাহাঙ্গীর, মমতাজ হোসেন, ফরিদপুরের শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, চট্টগ্রামের এস এম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মুকুল বোস, মানিকগঞ্জের গোলাম মহিউদ্দিন, তেজগাঁও কলেজের আকবর আলী মর্জি, তাহের, শওকত, তিতুমীর কলেজের রফিক, আইডিয়াল কলেজের সালাম, বাতেন, জাহাঙ্গীর, জগন্নাথ কলেজের মোহন, কামাল, সরোয়ার্দী কলেজের হেলাল, নান্দু ও কামাল মজুমদার, ঢাকা সিটি কলেজের মামুন, ঢাকা কলেজের দেলওয়ার, সেলিম, লিয়াকত, লালমাটিয়া কলেজের পারভীন ও নাজমা সহ আরো অনেকে যাদের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে নাl

জেনারেল জিয়ার সামরিক আইনের বিরুদ্ধে ঐসময় ছাত্রলীগের এই গোপন কর্মতৎপরতা চালানো এতো সহজ ব্যাপার ছিল নাl ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রবিউল ভাইসহ অন্যান্য ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীদের নেতৃত্বে ৪ নভেম্বরের পঁচাত্তরের মৌন মিছিল সংগঠিত করা হয়েছিলl তাদের নেতৃত্বেই ঢাকায় শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিরোধ যুদ্ধ। সামরিক শাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছাত্রলীগ কর্মীরা ৪ নভেম্বরের মৌন মিছিলকে সফল করে তোলার জন্য ঢাকা শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রচারপত্র বিলি করেl

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই খন্দকার মোস্তাকের ডাকা সভায় ঢাকায় অবস্থানরত সংসদ সদস্যদের উপস্থিত না থাকার জন্য হুমকি চিঠি বিলি করা হয়l এই কঠিন মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী রবিউল ভাই সর্বক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এক সময় মিথ্যা অভিযোগে জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার তাকে গ্রেপ্তার করেl  পরে হাইকোর্টে রিট করে ১৯৭৮ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ছাত্রলীগকে সংগঠিত এবং আওয়ামী লীগকে পুনরোজ্জীবিত করতে কাজ শুরু করেন মোকতাদির চৌধুরী। তার এসকল আন্দোলন ও কর্মসূচিতে আজকের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সব সময় পাশে ছিলেনl

পরে রবিউল ভাই সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও গোপনে রাজনৈতিক কার্যকলাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখেনl ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যার পাশে বিশ্বস্ততার সঙ্গে তিনি তার এই দায়িত্ব একটানা পাঁচ বৎসর পালন করেনl ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিটির সভাপতিl নবম জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচনে প্রথমবার বিজয়ী হন।

ধারণা করছি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে  রবিউল ভাইয়ের প্রতিপক্ষরা দুর্বলl পর পর দুইবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জনগণের ভাগ্যন্নোয়নে তিনি দিনরাত কাজ করেছেন। সদর ও বিজয়নগর উপজেলায় বিগত প্রায় চার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছেন।

এলাকার  রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্কুল কলেজের সম্প্রসারণ, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, নদী-খাল খনন, ওভারপাস নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। দুটি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুৎও নিশ্চিত করা হয়েছে। বেড়েছে শিক্ষার হার এবং জনগণ পেয়েছে উন্নত জীবনের ছোঁয়া।

শহরের যানজট নিরসনে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন ফ্লাইওভার বা ওভারপাস। খালপাড়ে সেতু নির্মাণসহ শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধণের জন্য নেওয়া হয়েছে নতুন নতুন পরিকল্পনা। প্রায় ৪০ কোটি টাকায় নির্মাণ হয়েছে ‘শেখ হাসিনা সড়ক’।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর মধ্য গঙ্গার দুই পারের মানুষকে এক সুতোঁয় গেঁথেছে বহু আকাঙ্ক্ষিত ২৪ ফুট চওড়া ও নয় কিলোমিটার দীর্ঘ  সড়কটি।

উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর প্রতিপক্ষরা এলাকাবাসীদের কাছে তেমন পরীক্ষিত ও  গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করছি। তাই এই উন্নয়নের ধারাকে ধরে রাখতে মোকতাদির ভাইয়ের জয় চাইছি।

সাধারণ ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে, এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জিতবে। আর সে ক্ষেত্রে রবিউল ভাইয়ের মন্ত্রিসভায় যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।  

লেখক: স্টকহোল্ম প্রবাসী কলামিস্ট ও সুইডিশ  রাজনীতিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :