বিশ্বজিতের পলাতক খুনিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টাই নেই

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৯ জুন ২০১৯, ১০:৫০ | প্রকাশিত : ২৯ জুন ২০১৯, ১০:৪৪

পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ দাসের বেশিরভাগ খুনি ধরা পড়েনি সাড়ে ছয় বছরেও। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুজনের একজন এবং যাবজ্জীবন কারাদ- পাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের কোনো খবর নেই। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও স্ব স্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আসামিদের কাউকে চিনতেই পারেননি। এমনকি আলোচিত এই হত্যার কথা বলা হলেও তারা কিছুই বলতে পারেননি।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামির মধ্যে রফিকুল ইসলাম শাকিল কারাগারে থাকলেও রাজন তালুকদার বছর দুয়েক আগে ভারতের কলকাতায় ছিলেন, সেটা স্পষ্ট। ২০১৭ সালের আগস্টে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আর দেশে না ফেরার কথা জানিয়েছিলেন।

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর হাইকোর্ট থেকে যাবজ্জীবন কারাদ- পাওয়া চারজনের মধ্যে মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হক এমদাদ, জি এম রাশেদুজ্জামান শাওন কারাগারে। তবে পলাতক আছেন এ এইচ এম কিবরিয়া।

আর বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল না করা ১১ জনের একজনেরও খোঁজ নেই বিচার শুরুর আগে থেকেই।

বিশ্বজিৎকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, একই রকমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন বরগুনায় রিফাত শরীফ। তাকেও প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর বিশ্বজিতের খুনিদের মতোই এই খুনিরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায় কি না এ নিয়ে কথা উঠেছে।

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপি-জামায়াতের অবরোধ চলাকালে বিরোধী দলের পিকেটার সন্দেহে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কয়েকজন কর্মী।

২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক এ বি এম নিজামুল হক ২১ আসামির মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদ- ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এদের সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া ১১ জন এবং মৃত্যুদণ্ড পাওয়া রাজন বিচার চলাকালেই ছিলেন পলাতক। তবে ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট হাইকোর্ট দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে প্রাণদণ্ড পাওয়া চারজনকে দেয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। দুজনকে দেওয়া হয় খালাস। আর আপিল না করা ১১ জনের বিষয়ে রায়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ফলে তাদের বিচারিক আদালতের রায় বহাল থাকে।

বিচারিক আদালত এবং পরে হাইকোর্টের রায়ের দিন পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সে নির্দেশ আর পালন করা হয়নি।

এখনো পলাতক আছেন মীর নূরে আলম লিমন, ইউনুছ আলী, তারিক বিন জোহর তমাল, আলাউদ্দিন, ওবায়দুর কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, আল-আমিন, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন।

সাজাপ্রাপ্ত এই আসামিরা কোথায় আছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এমনকি তাদের গ্রেপ্তারে কোনো উদ্যোগ বা চেষ্টাও নেই।

এর মধ্যে অন্তত পাঁচজনের বিদেশে অবস্থানের তথ্য নানা সময় প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। বাকিরা দেশে আছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য বলতে পারছেন না কেউ।

সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই মামলায় অনেক আগেই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে দেওয়া আসামির স্থায়ী ঠিকানায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চলে যায়। ওই থানার ওসির দায়িত্ব এই পরোয়ানা তামিল করা।’

ফাঁসির আসামি রাজন কলকাতায়?

উচ্চ আদালত থেকে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া রাজন তালুকদার ভারতের কলকাতায় পালিয়ে গিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন বলে তথ্য ছিল। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধ থাকা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চালুও করেন তিনি। তবে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়।

রাজনের বাড়ি সুনামগঞ্জে। তার অবস্থান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুল্লাহ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই ধরনের ঠিকানা (রাজনের বাড়ি) আমাদের থানায় নেই। এই ধরনের কোন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তথ্য আমাদের রেজিস্ট্রারে নেই।’

যাবজ্জীবন পাওয়া ‘চারজন বিদেশে’

বিচারিক আদালতে প্রাণদণ্ড এবং হাইকোর্টে সাজা কমে যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া মীর মো. নূরে আলম ওরফে লিমনের বাড়ি রংপুরের পীরগাছায়। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘না এই আসামির ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’

যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের নারায়ণপুর এলাকার কামরুল হাসান এখন আছেন মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকে ফেসবুকে তিনি পোস্টও দেন।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের আল আমিন শেখ বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পরপরই কলকাতায় পালিয়ে যান। সেখানে তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরিও নেন বলে তথ্য আছে।

নোয়াখালীর ওবায়দুল কাদের ওরফে তাহসিন ভারত হয়ে দুবাই পালিয়ে গেছেন বলে তার বন্ধুদের মাধ্যমে জানা যায়। তার বাড়ি হাতিয়ার এক নম্বর ওয়ার্ডের চরকৈলাশ গ্রামে।

বগুড়ার সওজ আমতলা এলাকার সামসুজ্জোহার তারিক বিন জোহর ওরফে তমালও বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পর প্রথমে মালয়েশিয়ায় এবং সেখান থেকে সিঙ্গাপুর চলে যান বলে তথ্য আছে।

বাকিদের মধ্যে ফরিদপুরের সদরপুরের চরচাঁদপুর এলাকার ইমরান হোসেন ওরফে ইমরান, নড়াইলের কল্যাণখালী এলাকার রফিকুল ইসলাম দেশে আছেন বলেই তাদের ঘনিষ্ঠজনরা গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন।

মাগুরার গাংনালিয়ার ইউনুস আলী মাঝেমধ্যেই বাড়ি আর ঢাকায় যাতায়াত করেন। ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক নেতার সঙ্গে বছর দুয়েক আগেও তাকে দেখা গেছে।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শ্রীনগর এলাকার মোশারেফ হোসেনকে বছর দুয়েক আগেও পুরান ঢাকার ওয়ারীতে একটি অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। একই উপজেলার রাধানগর মধ্যপাড়া মোল্লাবাড়ির মনিরুল হক ওরফে পাভেলকেও নানা সময় ঢাকাতে দেখা গেছে।

ছাত্রলীগের কর্মী ও বন্ধুদের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার খানজাহান আলী থানার গিলাতলা এলাকার আজিজুর রহমান ওরফে আজিজকেও প্রকাশ্যে দেখা গেছে নানা সময়।

পুলিশের খাতায় ‘পলাতক’ মো. আলাউদ্দিন গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন বলে তার স্বজনদের তথ্য। তার বাড়ি পঞ্চগড়ের আটোয়ারির ছোট ধাপ এলাকায়।

ঢাকাটাইমস/২৯জুন/এএ/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :