এক ‘খুনির’ ধরা পড়ার গল্প

মহিবুল ইসলাম খান
 | প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ২০:২৭

মমতাজ বেগম জিম্মি (১৪)। কুড়িগ্রামের উলিপুরের চর ঘুঘুমারী গ্রামের এক কিশোরী। প্রত্যন্ত এই গ্রামেও শিক্ষার আলো এসেছে, সেই আলোর স্পর্শ পেতে সে নিজেও স্কুলে যায়। বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে খেয়া পার হয়ে নিয়মিত যেতে হয়। প্রতিদিনের মতো গত ১৫ অক্টোবর সে বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলে যায়। সন্ধ্যা হয়ে যায় জিম্মির কোনো দেখা নেই।

তার মা বাবা দিশেহারা হয়ে এ বাড়ি সে বাড়ি খুঁজেন। দুই দিন পর ১৮ অক্টোবর রৌমারী থানায় এসে একটি হারানো জিডি করেন। পরদিন চর ঘুঘুমারীর কাঁশবনের ভেতর নিজেরই ওড়না দিয়ে হাত পা বাঁধা অবস্থায় তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। রৌমারী থানায় এ সংক্রান্তে একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। মামলার তদন্তভার দেয়া হয় এসআই আখতারকে।

ঘটনাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় প্রথম থেকেই মামলার রহস্য উদঘাটনের জন্য আমি তাগাদা দিতে থাকি। আইওকে নির্দেশনা দেই জিম্মির বাড়ি গিয়ে তার বই খাতা ভালোভাবে চেক করতে। তাতে কোনো নাম বা মোবাইল নম্বর পাওয়া যায় কি না তা দেখতে। মিলেও যায় একটি নাম ও নম্বর। আমরা আশান্বিত হয়ে উঠি।

তবে আইওকে বলি একেবারে নিশ্চিত না হয়ে কাউকে হত্যা মামলায় চালান দেয়া যাবে না। আখতারও সূত্র খুঁজতে থাকে। প্রযুক্তির সহায়তায় বুঝতে পারি ঘটনার সময় উক্ত ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না। একটু দমে যাই আমি, ওসি রৌমারীকে তাগাদা দিই যেভাবেই হোক খুনিদের শনাক্ত করতে হবে।

এসআই আখতার হাল ছাড়েননি। টানা ১৭ দিন তিনি চর ঘুঘুমারীতে অবস্থান করেন। থানা থেকে বেশ দূরে যোগাযোগ ও থাকার ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক। তথ্য ও প্রমাণ খুঁজতে থাকেন। অবশেষে পেয়ে যান।

আমাকে জানালে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেই আমার আগের ইউনিট সিটিটিসি, ডিএমপি থেকে। মিলেও যায় আসামিদের অবস্থান। এসআই আখতারকে নির্দেশ দিই আসামিদের গ্রেপ্তার করার। গ্রেপ্তার করা হয় নুরুন্নবী ও হামিদুলকে। অকপটে (আখতারের ভাষায় তোতা পাখির মতো) তারা হত্যার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। বিস্মিত হই হামিদুলের কথায়, সে নিজে প্রতিবন্ধী। ঠিকমত কথা বলতে পারে না, শারীরিক সমস্যা রয়েছে। নিজেদের দায় পুরোপুরি স্বীকার না করে কৌশলে এড়িয়ে যায় তারা। জানায় আরও তিনজন জড়িত হত্যাকাণ্ডে। তারা শুধু পাহারা দিয়েছে। বাকিরা ঘটনার পর থেকেই টাঙ্গাইল চলে গেছে ইটভাটায় কাজ করতে।

ওসি রৌমারীকে বলি দ্রুত টাঙ্গাইলে ফোর্স পাঠাতে। সাথে যায় জিম্মির পরিবারের সদস্যরা। নাম শুনেই জড়িতদের চিনতে পারে তারা। চেহারা শনাক্ত করতেই তাদের পাঠানো। অবশেষে ধরা পড়ে রমজান, রাজ্জাক ও দুখু। সবার বাড়ি জিম্মির বাড়ির পাশেই। আমি ব্যস্ত বিভাগীয় পরীক্ষার খাতা দেখা নিয়ে, তবুও নিজে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম।

আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায় রমজান ইতিপূর্বে জিম্মিকে প্রেম নিবেদন করলে জিম্মি তাতে সাড়া দেয়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে অন্যান্যদের নিয়ে জিম্মিকে ধর্ষণ ও হত্যার পরিকল্পনা করে এবং ঘটনার দিন সকলে মিলে তা বাস্তবায়ন করে। এতে প্রতিবন্ধী হামিদুলই বড় ভূমিকা পালন করে।

এখনকার দিনে যেকোনো মামলার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ নানাভাবে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়। এই মামলার ক্ষেত্রে আমরাও সেভাবেই চেষ্টা করি। তবে মামলার রহস্য উদঘাটন হয় একেবারেই ভিন্নভাবে। ঘটনার পর আসামি নুরুন্নবীর ভেতর নানারকম মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সে প্রায়ই ঘুমের ঘোরে কাশগড় (কাঁশবন) বলে চিৎকার করে উঠতো এবং এক পর্যায়ে নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে মায়ের বাসায় এসে থাকা শুরু করে। বিষয়টা এলাকার অনেকেরই নজরে আসে।

মামলার আইও ১৭ দিন ওই এলাকায় অবস্থান করার কারণেই বিষয়টি জানতে পারে। তা না হলে আরও অনেক মামলার মতো একটা ফাইনাল রিপোর্টেই হয়তো মামলার সমাপ্তি ঘটতো। এই মামলা তদন্তে সাফল্যের জন্য পুলিশ সুপারের তরফ থেকে এসআই আখতারকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

লেখক: পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রাম

সংবাদটি শেয়ার করুন

নির্বাচিত খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :