ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে

ড. নেয়ামত উল্যা ভুঁইয়া
 | প্রকাশিত : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৮:৫৮

(পর্ব--৩)

০২. মাত্রা:

অক্ষর উচ্চারণের কাল-পরিমাণই মাত্রা। একটি অক্ষর উচ্চারণের জন্য যে সময় প্রয়োজন হয়, সে সময় অনুযায়ী প্রতিটি অক্ষরের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ ‘মাত্রা’ হলো একটি অক্ষর উচ্চারণের সময়কাল। ইংরেজিতে বলা হয় MORA (a unit in phonology that determines syllable weight, which in some languages determines stress or timing). সাধারণত:, অক্ষর ও মাত্রার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য না থাকলেও মনে রাখা দরকার যেঃ অক্ষর নয়, অক্ষরের মাত্রাই ছন্দের মূল সমতা বজায় রাখে। যেমন-

কা+গ+জে ও ক+ল+মে কি / সব লি+খা যায়?

ভূ+মি+কা+টা টান+তেই / কা+লি+যে ফু+রায়।

সব ক+থা ফু+রা+বে না / খা+তার পা+তায়,

তো+মার হৃ+দ+য়ে সব+ই / লি+ খি ক+বি+তায়।

০৩. যতি, বিরাম, ছেদঃ যতি হতে পারে হ্রস্ব ও দীর্ঘ। সে সব সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে বাক্যের বিভিন্ন ভাব, (যেমন: জিজ্ঞাসা, বিস্ময়, সমাপ্তি ইত্যাদি) সার্থকভাবে প্রকাশের মাধ্যমে বাক্যের অর্থ সুস্পষ্ট করা হয়। বাংলা ভাষায় ২০টির মতো যতিচিহ্ন রয়েছে। এদের মধ্যে বাক্যশেষে ব্যবহার্য যতিচিহ্ন ৪টি; বাক্যের ভিতরে ব্যবহার্য ১০টি এবং বাক্যের আগে পরে ব্যবহার্য ৬টি।

উচ্চারণের বিরতিকে যতি বা ছেদ বলে। আমরা যখন কথা বলি, তখন নিশ্চয়ই অনর্গল বলি না, কথা বলবার মাঝে মাঝে থেমে যাই। অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চারণের বিরতি বা‘ছেদ’(Pause) পড়তে পারে। কবিতার ছন্দের আদর্শের প্রতি লক্ষ্য রেখে তা করা হয়। আর বাক্যাংশ প্রকাশের জন্য হ্রস্ব যতি (কমা, সেমি-কোলন, হাই-ফেন,কোলন, ড্যাশ ইত্যাদি) এবং প্রতি চরণের শেষে উচ্চারণের বিরতির দিতে পূর্ণযতিচিহ্ন (যেমন, বিস্ময়সূচক, প্রশ্নবোধক, দাড়ি ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয়। যেমন,

পাড়ের কড়ি লাগবে কেনো আমার ঘাটে?

এই ঘাটেতো সব নোঙ্গরই তোমার দেয়া।

রূপোর কড়ি মজুদ রাখো শক্ত গাঁটে,

তোমার দেখাই চুকিয়ে দেবে সব বকেয়া।

আলতো চালে আঁকবে তোমার পায়ের রেখা,

কূলে কূলে পেতে রাখা পাটাতনে,

কাজলা জলে চলবে প্রেমের কাব্য লেখা;

প্রচার হবে রহস্যময় বিজ্ঞাপনে।

০৪. পর্ব, অতিপর্ব, উপপর্ব, পর্বাঙ্গ:

কবিতার প্রতিটি লাইনে সমমাত্রার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশই পর্ব। আর পঙক্তি শেষের পর্বাংশকে বলা হয় অতিপর্ব। অতিপর্বের মাত্রা সংখ্যা পর্বের মাত্রা সংখ্যা থেকে সর্বদাই কম। পর্বাংশ চরণের শুরুতে থাকলে তাকে বলা হয় উপপর্ব। অন্য কথায়, কবিতায় অর্ধযতি বা হ্রস্বযতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ধ্বনি সমষ্টিকে ‘পর্ব’ এবং পর্বের ছোট ছোট বিভাগকে ‘পর্বাঙ্গ’ বলা হয়। পর্বকে কেউ কেউ পদও বলে থাকে। যতি চিহ্নের প্রয়োগের ফলে কবিতার চরণ কতগুলো ধ্বনিতে বিভক্ত হয়, এই খণ্ডিত ধ্বনি-প্রবাহই হচ্ছে পর্ব। এক যতি (অর্ধযতি) থেকে কিংবা চরণের প্রান্ত থেকে পরবর্তী যতি পর্যন্ত অংশকেই বলা হয় পর্ব। যেমন-

এত আদরের/বুজিরে তাহারা/ভালবাসিত না/মোটে,

হাতেতে যদিও/না মারিত তারে/শত যে মারিত/ঠোঁটে।

উপরের দুটি চরণের প্রতিটিতে চারটি পর্ব। আর প্রতিটি পর্বের ক্ষুদ্র অংশগুলো হচ্ছে পর্বাঙ্গ। কবিতার চরণের যতটুকু অংশ এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়, তাই পর্ব। সেটাই পর্ব চেনার সহজ উপায়।

০৫. পঙক্তি ও চরণ:

‘পঙক্তি’ বলতে এক সারিতে সাজানো শব্দাবলিকে বোঝায়। লাইন, ছত্র, শ্রেণি প্রভৃতি অর্থে ‘পঙক্তি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন-

কবিতায় পূর্ণযতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পূর্ণ ধ্বনিপ্রবাহের বা ছন্দোবিভাগের নাম 'চরণ'। একটি সম্পূর্ণ বাক্য কবিতায় চরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ছন্দের পূর্ণরূপ প্রকাশের জন্য যতগুলো পর্বের প্রয়োজন, ততগুলো পর্ব নিয়ে একটি চরণ গঠিত হয়। তাই পর্বসমষ্টিকেই চরণ বলে:

একটু যদি∣ আনমনা হয়∣ খোকার ছায়া∣ ভাসে,

মা’র মমতার∣ বাহুর ডোরে∣ খিলখিলিয়ে∣হাসে।

চেতন ফিরে∣ আসলে বোঝে∣ মনের ভীষণ∣ধোঁকা,

এই ছায়াতো∣ মায়ার ছায়া∣ নয়তো মায়ের∣ খোকা।

উপরে প্রতিটি চরণে ৩টি পূর্ণ এবং ১টি অপূর্ণ পর্ব রয়েছে। এভাবে ৪টি চরণ গঠিত হয়েছে। স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রত্যেক চরণকে এক পংক্তিতে সাজানো হয়েছে। চরণ ও পঙক্তি সমার্থক নয়। একটি চরণ যেমন একটি পঙক্তিতে গঠিত হয়েছে, তেমনি চরণ ভেঙ্গে একাধিক পঙক্তিতেও সেটিকে সাজানো যায়। যেমন:-

পুণ্যের এখন আকাল ভীষণ; পাপের বাজার রমরমা,

পুণ্য থাকে ব্যয়ের খাতায়; পাপই কেবল হয় জমা।

বইবে চোখে অশ্র নদী, সীমার মাঝে না রও যদি,

পাপ করা চাই তত্তোটুকু; যত্তোটুকুর হয় ক্ষমা।

উপর্যুক্ত চারটি চরণকে ভিন্ন রূপে সারিবদ্ধ করে নিম্নরূপ পঙক্তিতেও সাজানো যায়:

পুণ্যের এখন আকাল ভীষণ,

পাপের বাজার

রমরমা,

পুণ্য থাকে ব্যয়ের খাতায়;

পাপই কেবল

হয় জমা।

বইবে চোখে অশ্র নদী,

সীমার মাঝে না-রও যদি,

পাপ করা চাই তত্তোটুকু;

যত্তোটুকুর

হয় ক্ষমা।

০৬. স্তবক:

স্তবক আসলে ভাবপূর্ণ চরণগুচ্ছ। দুই বা এর অধিক চরণ সুশৃঙ্খলভাবে একত্রিত হলে তাকে ‘স্তবক’ বা STANZA বলা হয় । এক একটি স্তবকে কবিতার মূলভাব অন্তত আংশিক প্রকাশ পায়। সব ক’টি স্তবক মিলে কবিতার সমগ্র ভাবের প্রকাশ ঘটায়। সাধারণতঃ কবিতার স্তবকগুলো পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়। কবির ইচ্ছানুসারে দুই, তিন, চার প্রভৃতি যে কোন সংখ্যক চরণ নিয়ে স্তবক গঠিত হয়। যেমন নিচের কবিতাটিতে নয় চরণের ৩টি স্তবক রয়েছেঃ

প্রথম স্তবক:

শুধু প্রেম নিয়ে লেখা হলো এতো

নাটক,নভেল,কবিতা,গান,

উপসংহারে পৌঁছেনি তবু প্রেমের উপাখ্যান।

দ্বিতীয় স্তবক:

যতো লিখে ততো পরিধিই বাড়ে

মেলেনা প্রেমের সীমা বা তল,

ভাব আর রূপে প্রেম পেয়ে যায় নিত্য উদয়াচল।

তৃতীয় স্তবক:

প্রেমের ভুবন প্রহেলিকা ঘেরা

কল্পনামেঘের চাদরে ঢাকা,

মানুষ চেনে না প্রেমের ম্যাপের অক্ষ-দ্রাঘিমা রেখা।

০৭. দ্বিক (Couplet):

বর্তমান আর ∣ অতীত যদি ∣ বিবাদ বাঁধায় ∣ নিত্য,

ভবিষ্যতই ∣ ধ্বংস হবে ∣ খুইয়ে বেসাত- ∣ বিত্ত।

০৮. ত্রিপদীকা (Tercet):

মিষ্টি কথার ∣ শিসটি এখন ∣ যুগের হাওয়ায় ∣উড়ে,

পকেট ফাঁকা ∣ থাকলে এখন ∣ প্রেম স’রে যায় ∣ দূরে,

প্রেমতো এখন∣ ঠোঁটে ঠোঁটে ∣ নোটে নোটে ∣ ঘোরে ।

০৯. চতুষ্ক (Quatrain) :

ফুলে ফুলে | ঢ’লে ঢ’লে || বহে কিবা | মৃদু বায়, I

তটিনী হিল্ | লোল তুলে || কল্ লোলে চ | লিয়া যায়। I

পিক কিবা | কুন্ জে কুন্ জে || কুহু কুহু | কুহু গায়, I

কি জানি কি | সের লাগি || প্রাণ করে | হায় - হায়।I

১০. মিল:

সাহিত্যের কাজ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তাঁর জীবনের প্রথম সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা ছিল ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ পড়া। তিনি লিখছেন, ‘সেদিনের আনন্দ আজও যখন মনে পড়ে তখন বুঝিতে পারি, কবিতার মধ্যে মিল জিনিসটার এত প্রয়োজন কেন। মিল আছে বলিয়াই কথাটা শেষ হইয়াও শেষ হয় না – তাহার বক্তব্য যখন ফুরায় তখনো তাহার ঝংকারটা ফুরায় না – মিলটাকে লইয়া কানের সঙ্গে খেলা চলিতে থাকে। এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া সেদিন আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল। শব্দ, ছন্দ, ধ্বনি সকল কিছু একত্র হয়ে নাড়িয়ে দেয়, জাগিয়ে তোলে।তাই চৈতন্যের ব্যাপারটাই সব চেয়ে গুরত্বপূর্ণ।

পদ, পর্ব বা চরণের শেষে একই রকম ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছের ব্যবহারকে মিল বলে। অলংকারের ভাষায় একে অনুপ্রাস (Alletaration) ও বলে। ( অনু শব্দের অর্থ পরে বা পিছনে আর প্রাস শব্দের অর্থ বিন্যাস, প্রয়োগ বা নিক্ষেপ।একই ধ্বনি বা ধ্বনি গুচ্ছের একাধিক বার ব্যবহারের ফলে যে শ্রুতিমধুর ধ্বনিসাম্যের সৃষ্টি হয় তার নাম অনুপ্রাস। যেমন,’ গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি গরজে গগনে গগনে।’

-চলবে

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :