এইচএসসির ফল বিশ্লেষণ

প্রতিবার ফলাফলে মেয়েরাই যে কারণে এগিয়ে

তানিয়া আক্তার, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৩:৩৯ | প্রকাশিত : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৩:৩১

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ফলাফলে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে। মেয়েদের এ সাফল্যের ধারা অব্যাহত রয়েছে গত ১৪ বছর ধরে।

গত রবিবার (২৬ নভেম্বর) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, ৯ সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে মোট পাসের হার ৭৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। এর মধ্যে, মেয়েদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৬১ শতাংশ, ছেলেদের পাসের হার ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ।

মেয়েদের এ সাফল্য সম্পর্কে শিক্ষাবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা সবসময়ই মেয়েশিশুদের পক্ষে ছিলো। এছাড়াও উপবৃত্তিসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধা চলমান রয়েছে সবসময়। ফলে প্রথম দিকে বুঝতে না পারলেও এখন এটি দৃশ্যমান।

মেয়েদের এ সাফল্যের পেছনে তিনটি কারণ বলেছেন রাশেদা কে চৌধুরী। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমত বাংলাদেশে সর্বস্তরে শিক্ষার চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রায় সব বাবা-মায়েরাই মেয়েদের পড়াশোনা করাতে আগ্রহী। দ্বিতীয়ত সরকার বদলালেও মেয়েশিশুদের প্রতি অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন বদলায়নি। যেমন বিনাবেতনে মেয়েদের পড়ালেখা। প্রথমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনাবেতনে মেয়েদের পড়ালেখার সুযোগ তৈরি করা। এরপর অষ্টম শ্রেণি এবং দ্বাদশ শেণি পর্যন্ত সেই সুযোগ বর্ধিত করা হলো। তৃতীয়ত মেনস্ট্রুলয়াল হাইজিনের দিকে বাংলাদেশে অনেক এগিয়ে গেছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভেন্ডিং মেশিনও আছে। এছাড়াও উপস্থিতির হার, অংশগ্রহণের হার এবং পড়ার প্রতি মনোযোগ বেড়েছে।

বৈশি^ক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েরা যদি ন্যূনতম অষ্টম শেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ পায় তাহলে তার সন্তান নিরক্ষর হয় না এবং অপুষ্টিতে ভোগে কম। ফলে মেয়েদের পেছনে বিনিয়োগ করলে সেটার সুফল পাওয়া যায় এমনটা যোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে দেশের আরেক শিক্ষাবিদ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলো, আমাদের দেশের মেয়েরা ঘরের বাইরে খুব বেশি বিচরণ করে না। ঢাকায় মেয়েদের কিছুটা বিচরণ লক্ষ্য করলেও গ্রামে ব্যাপক অর্থে দেখা যায় না। ফলে যতটা সময় ঘরে থাকে মোবাইলে সময়টা কম দেয়। শহরাঞ্চলে কিছুটা থাকলেও গ্রামে একেবারে নেই বললেই চলে। মফস্বলেও মেয়েদের কম বের হতে দেখি। ফলে তাদের সময়গুলো পড়ায় বেশি কাজে লাগায়। অপরদিকে ছেলেরা মোবাইল হাতে নিয়ে বিস্তর সময় নষ্ট করছে। বাইরে আড্ডা দেওয়ায় বেশি ব্যস্ত থাকে। ছেলেদের মাধ্যমেই কিশোর গ্যাং তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত এখনও এদেশের মেয়েদের পরিবারগতভাবে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়। তারাও ভাবে মা-বাবা ছেড়ে তাদের এই পরিবার থেকে বিদায় নিতে হবে। ফলে কিশোরী বয়সেই মায়ের কাজেও সাহায্য করা, বাবার যত্ন নেয়াসহ নানাবিধ দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়। ফলে মেয়েদের কাজের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু এখনও অনেক পরিবার এই দায়িত্বশীলতার জায়গায় ছেলেদের দেখতে চায় না। রান্নাঘরে ছেলেদের দেখলে সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। যদিও এই অবস্থার অবসান করতে হবে। আমি মনে করি ছেলেদেরও মেয়েদের মতো রান্নায় অংশগ্রহণ করতে হবে। যেহেতু এখনও এই চর্চা গড়ে ওঠেনি তাই দায়িত্বশীলতা তৈরিতে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে থাকায় পড়াশোনার ব্যাপারেও গুরুত্ব থাকে।

তৃতীয়ত, মেয়েদের ব্যাপারে একটা সময় বলা হতো যে, বিয়ে করে অন্যের বাড়ি চলে যাবে তাই পড়ালেখা করে কী লাভ! এটা বহুদিন ধরে চলেছে। তবে বর্তমান বাংলাদেশ এই বিয়েকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখন অনেক পরিবার চায় তাদের মেয়ে সন্তানও চাকরি করুক। ফলে তারা মনে করেন যে বাবা মা তাদের বিয়ের জন্য নয় বরং জীবনের জন্য পড়াচ্ছেন। এটা অনেক বড় উন্নতি। নেপাল, শ্রীলংকাসহ যেসব দেশ এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসেছে তারাই উন্নতি করেছে।

বিয়েকেন্দ্রিক পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে বাংলাদেশে এই পথটি দেখিয়েছে নারী পোশাককর্মীরা। তারা কারও বাসায় কাজের মেয়ে না হয়ে যখন পোশাকশ্রমিক হলো তখন প্রথম উপার্জনের টাকা দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব দিলো। এখন তাদের সন্তানেরা বিশ^বিদ্যালয়েও পড়াশোনা করছে। এছাড়াও বিভিন্ন এনজিও নারী শিক্ষা বেশ বিস্তৃত করেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনজিওগুলি মেয়েদের বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। মেয়েদের নানাক্ষেত্রে সাফল্য অন্যদেরও উৎসাহিত করছে।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেয়েদের এগিয়ে থাকার কারণ হিসেবে সরকারি গোলাম হায়দার খান মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ওয়াজেদ কামাল বলেন, ছেলেরা স্বাধীনতা পেয়ে বাইরের জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কখনও কখনও অসৎ সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। অন্যদিকে মেয়েরা ঘরেই বেশি সময় থাকায় বাইরের জগতের নানা বিষয়ের সঙ্গে জড়ায় না। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘ দেশের মেয়েরা ঐতিহাসিকভাবেই পিছিয়ে থাকাদের তালিকায় ছিলো। এখন মেয়েরা পরীক্ষার ফলাফলে ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে এটা ভালো সংবাদ। এর কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এক্ষেত্রে মেয়েদের ধারাবাহিক ভালো ফলাফলে ছেলেদেরও ভূমিকা রয়েছে। কারণ একটা সময় মেয়েরা ইভটিজিংয়ের শিকার হতো। এখন ছেলেরা পথে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সহজভাবে মেয়েদের গ্রহণ করেছে। এছাড়া দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে দেখেছি মেয়েরা পড়ায় মনোযোগী বেশি থাকে। ছেলেরাও পড়ায় মনোযোগী থাকে তবে তাদের আরও দশটি কাজে হয়তো মনোযোগ দিতে হয়। ফলে মেয়েদের মতো পড়ায় এতটা সময় দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফলে ছেলেরা কিছুটা পিছিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেয়েরা নানা ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলো। এখন তাদের সামনে সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগটা তারা গ্রহণ করেছে। মেয়েদের একটা সময় কম বুদ্ধি রয়েছে বলে মনে করা হতো। এখন বিজ্ঞানসম্মতভাবে এটি প্রমাণিত যে মেয়েরা সুযোগ পেলে যে ভালো করে। এছাড়া বাইরের জগতের সাথে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সুযোগ সীমিত। ফলে আমাদের দেশে যে ধরণের পড়ালেখা ও পরীক্ষা পদ্ধতি অর্থাৎ মুখস্ত করার প্রবণতা এগুলো ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি রয়েছে। বর্তমানে পড়ালেখার নানাবিধ সুযোগ এবং বাইরের জগত থেকে সীমাবদ্ধ জীবন বিদ্যমান পড়ালেখায় মেয়েরা ভালো করছে।

শিক্ষাবিদ মালেকা বেগম বলেন, মেয়েদের অন্যান্য সুযোগগুলো সীমিত থাকায় ডিগ্রি নেয়ার পড়ার প্রতি আগ্রহ বেশি। এছাড়া বাড়িতে মেয়েরা বেশি অবস্থান করে। পরিবারও মেয়েদের বাড়িতেই থাকার জন্য বলে থাকে। ফলে মেয়েরা মায়ের নজড়দারিতে থাকে। এতটা সময় ঘরে বসে মেয়েরা আর কী করবে। তাই পড়াশোনা করে। ফলে মেয়েরা পরীক্ষার ফলাফলে এগিয়ে থাকে।

(ঢাকাটাইমস/০২ডিসেম্বর/জেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :