নারুহিতো: উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত

ড. মো. মনির উদ্দিন
| আপডেট : ১৭ জুন ২০১৯, ১৩:৩৯ | প্রকাশিত : ১৭ জুন ২০১৯, ১২:৫৭

জাপানের সম্রাট আকিহিতোর স্বেচ্ছা অবসরের ফলে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেছেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র নারুহিতো। সম্রাট নারুহিতো জাপানের ১২৬তম সম্রাট এবং ১ম সম্রাট জিন্মু থেকে শুরু করে এই ১২৬তম সম্রাট নারুহিতো পর্যন্ত সকল সম্রাটই একই বংশের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার। ১ম সম্রাট জিন্মু সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন ১১ ফেব্রুয়ারি ৬৬০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে। এই দিনটি বর্তমানে জাপানের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে জাতীয় ছুটির দিন।

সেই হিসেবে, এই ধারাবাহিক উত্তারিকারের বয়স ২ হাজার ৬৭৮ বছরেরও বেশি, যা বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকা কম-বেশী ৪৫টি রাজবংশের মধ্যে দীর্ঘতম। এর নিকটতম রাজবংশ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে কম্বোডিয়ার রাজবংশকে, যার বয়স ২ হাজার বছরেরও কম। তাই বলা যেতে পারে, জাপানের রাজবংশ বর্তমান বিশ্বে উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত; আর এই অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠাও বিস্ময়কর। বিস্ময়কর এইজন্য যে, জাপানের ইতিহাস বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই সরলরৈখিক নয়। অনেক বাঁকা অলি-গলি পথ পার হয়েই বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে আজকের জাপান। তাই, জানা প্রয়োজন কীভাবে সম্ভব হলো এমন বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপনের।

জাপানের প্রাচীন কালে মনে করা হতো যে, সম্রাটের যাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি অন্য দেবতাদের সঙ্গে কথা বলেন। ৭ম শতাব্দীর শেষের দিকে সম্রাট তেন্মু জাপান ও সম্রাট পরিবারের ইতিহাস রচনার নির্দেশ দেন। যার ফলে, ৭১২ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় কোজিকি বা পুরাতন লিখিত দলিল এবং ৭২০ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় নিহনশকি বা জাপানের ধারাবাহিক কাহিনী। ইতিহাস রচনার মানদণ্ডে এ দুটি রচনায় লিখিত বিষয়গুলো যদিও প্রমাণ সাপেক্ষ, তথাপি সাধারণ জনগণের মধ্যে এর প্রভাব হয় সুদুর প্রসারী যা আজও বিদ্যমান।

কোজিকির বর্ণনা অনুযায়ী, জাপানের ভুমি তৈরী হয়েছিল স্বর্গীয় দেবতা ইজানাগি ও ইজানামির মাধ্যমে। ইজানাগির সন্তান আমাতেরাসু বা সূর্যদেবতারই বংশধর জাপানের প্রথম সম্রাট জিম্মু। যেহেতু, জিম্মু সূর্যদেবতা আমাতেরাসুর বংশধর, সেহেতু প্রত্যেক সম্রাটই দেবতার বংশধর। আর নিহনশকিতে উল্লেখ করা দেবতাদের বংশ তালিকাকে প্রথম থেকে শুরু করে এর রচনাকালের সম্রাট পর্যন্ত সংযুক্ত করা হয়েছে। 

যাইহোক, জাপানের ইতিহাস অনেক চড়াই-উতড়াইর মধ্য দিয়ে গেলেও, সম্রাটের এই দেবতার ভাবমূর্তির ফলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্তকরার প্রয়াস বা অন্য কোন পরিবার থেকে সম্রাট হওয়ার প্রয়াস কেউই পাননি। কারণ, সম্রাটের বিষয়ে জনগণের মনে গ্রন্থিত ছিল অগাধ বিশ্বাস ও শ্রাদ্ধাবোধ। যুগ ভেদে সম্রাটের ক্ষমতার তারতম্য হলেও, সম্রাটকে অস্বীকার করার সাহস কোন সামরিক বা বেসামরিক শাসকেরই হয়নি।

হেইয়ান যুগের (৭৯৪ খ্রীঃ-১১৮৫ খ্রীঃ) ফুজিওয়ারা পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়া সত্বেও তারা কখনই সম্রাট হওয়ার সাহস করেনি। কামাকুরা যুগ থেকে আজুচি মোমোইয়ামা যুগ শুরুহওয়া পর্যন্ত (১১৮৫-১৫৬৮) প্রায় ৪শত বছর জাপানে ছিল গৃহ যুদ্ধ। এ সময় প্রতিদ্বন্ধী শক্তিগুলো একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকলেও সম্রাটের বৈধতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। বরং বিবাদমান বিজয়ী দলগুলো বিজিত অঞ্ছল শাসনে সম্রাটের অনুমোদন নেয়ার প্রয়াস পেতেন। গৃহ যুদ্ধ থেকে জাপানের পুনরেকত্রীকরণে প্রধান ভুমিকা রাখা পরাক্রমশালী যোদ্ধা ওদা নবুনাগাও (১৫৬৮-১৫৮২) সাহস করেননি সম্রাটকে অস্বীকার করার।

যদিও তিনি সেনাশাসক হিসেবে সম্রাটের অনুমোদন প্রার্থনা করেননি এবং তিনি নিজেই একটি মন্দির বানিয়েছিলেন যেখানে তিনি চেয়েছিলেন তার নামে পূজা হউক। এমনকি, তিনি নিজের জন্মদিনকেও জাতীয় ছুটির দিন হিসেবেঘোষণা করেছিলেন। জাপানের দীর্ঘ ইতিহাসে ওদা নবুনাগার এই ঔদ্ধত্যটুকুছাড়া আর কাউকেই দেখা যায়না সম্রাটকে পরোক্ষভাবে হলেও অস্বীকার করতে। এমনকি জাপানের দীর্ঘতম সেনাশাসক পরিবার (১৬০০ খ্রীঃ -১৮৬৮ খ্রীঃ) তকুগাওয়া পরিবারও সেই সাহস দেখাননি। মেইজি যুগে (১৮৬৮-১৯১২) , তাইশো যুগে (১৯১২-১৯২৬) , ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর কালীন শোওয়া যুগেও (১৯২৬-১৯৮৯) জাপান রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে সম্রাটের নামেই। হেইসেই যুগ (১৯৮৯-২০১৯) এবং ১ মে ২০১৯ থেকে শুরু হওয়া রেইওয়া যুগেও জাপানের রাষ্ট্র চলছে সম্রাটের নামেই।

হেইয়ান যুগ পর্যন্ত সম্রাটের নির্বাহী ক্ষমতা বলেই রাষ্ট্র পরিচালিত হতো তার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মাধ্যমে। তবে, কামাকুরা যুগ থেকে তকুগাওয়া যুগ পর্যন্ত নির্বাহী ক্ষমতা থাকে উত্তরাধিকার সুত্রের সেনাশাসকদের হাতে। মেইজি যুগ থেকে সম্রাটের নামের আড়ালে নির্বাহী ক্ষমতা থাকে বেসামরিক গোষ্ঠীতন্ত্রের হাতে, যা তাইশো ও শোওয়া যুগের প্রথমদিক পর্যন্ত গণতন্ত্রের বাহ্যিক অবয়বে চলতে থাকে। মেইজি যুগ থেকে সম্রাটের নামে যে গোষ্ঠীতন্ত্র ছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর তাতে আমেরিকা ছেদ টানে। সম্রাট হিরোহিতোকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হয় যে তিনি দেবতা নন; তিনিও একজন সাধারণ মানুষ। সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে সম্রাটের পদটিকে করে ফেলা হয় একেবারেই আলংকরিক। কিন্তু, লক্ষণীয় যে, পরাক্রমশালী এই আমেরিকাও এই রাজতন্ত্রকে বিলুপ্ত করতে সাহসী হয়নি। অলংকার স্বরুপ হলেও তাদের এই আসনটি রেখে দিতে হয়।

কেন টিকে গেলো এত চড়াই-উতড়াই পার হয়েও সম্রাটের এই আসনটি? ৮ম শতাব্দীতে কোজিকি ও নিহনশোকির বর্ণনার মাধ্যমে সম্রাটের দেবতার ভাবমূর্তি নিয়ে এতদিন পর্যন্ত কথিত বিষয়গুলোএকটি লিখিত রুপ পায়। যার ফলে, পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের মধ্যে সম্রাটের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পেতে থাকে । দ্বাদশ শতাব্দীতে তৎকালীন বিশ্বের আতংক পরাক্রমশালী মঙ্গলীয়রা জাপন আক্রমণ করলেও, তারা অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষ জাপানের কাছে পরাজিত হয় প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে। জাপানিদের বিশ্বাস তৈরি হয় যে, দেবতা প্রদত্ত ঝড় বা কামিকাজের কারণেই মঙ্গলীয় আক্রমণ থেকে দেবতার তৈরি পবিত্রভূমি জাপান রক্ষা পেয়েছে। কোজিকিতে বর্ণীত জাপান যে দেবতা সৃষ্ট পবিত্রভুমি সে ধারণা তাদের মধ্যে আরো সুদৃঢ় হয়।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা সারা পৃথিবীতে উপনিবেশ গড়ছিল। জাপানও এই ভয় থেকে মুক্ত ছিল না। তাই, তকুগাওয়া যুগের শাসকেরা জাপানকে বিদেশী আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে বিদেশের সাথে সকল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং পবিত্র ভুমি রক্ষা করার জন্য জনগণের মধ্যে নিয়ে আসে সম্রাটের দেবতার ভাবমূর্তি। তৈরী হয় স্লোগান সননোজোই বা সম্রাটকে সম্মান করো আর বিদেশী বর্বরদের বিতাড়িত কর। জনগণের মধ্যে তৈরি হতে থাকে জাতীয়তা বোধ ও সম্রাটের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা।

মেইজি যুগের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্রাটের প্রতি জাপানীদের শ্রদ্ধার শিকড় কেবল গভীর থেকে গভীরতরই হয়েছে। মেইজি যুগে যে জাতীয় সংগীত প্রবর্তন হয়তা কেবলই সম্রাটের জন্য উতসর্গীকৃত; যা আজও জাপানের জাতীয় সংগীত। তাই, মানুষের মনে শিশুকাল থেকেই তৈরি হয় সম্রাট ও তার পরিবারের প্রতি ভিন্ন এক শ্রদ্ধাবোধ। সকল জাপানি নাগরিকেরই জানা আছে কোজিকি ও নিহনশকিতে বর্ণিত বিষয়গুলো যা সম্রাটের প্রতি কেবল শ্রদ্ধাবোধই তৈরি করে।

অনুমান করি এত বেশি শ্রদ্ধার আরো একটি কারণ হতে পারে এইযে, খুব কম সম্রাটই আছেন যারা ক্ষমতার দ্বন্ধে জড়িয়েছেন। সম্রাটের যখন প্রত্যক্ষ ক্ষমতা ছিল তখন সে ক্ষমতার প্রয়োগ হতো তার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মাধ্যমে। হেইয়ান যুগের পর থেকে তকুগাওয়া যুগের শেষ পর্যন্ত সামরিক যোদ্ধাদের সম্রাটের নামে দেশ চালনায় সম্রাট গোদাইগোর ব্যতিক্রম বিরোধীতা ছাড়া আর কোন সম্রাট কখনও বাধা হয়ে দাড়াননি। বলাযায় জাপানের ইতিহাসের এই সম্রাটেরা বরাবরই শান্তি প্রিয় ছিলেন। ২য় বিশ্বযুদ্ধে সম্রাট হিরোহিতোর প্রত্যক্ষ যুদ্ধ সংশ্লিষ্টতা কতটা ছিল তাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। হেইয়ান যুগে দেখা যায় যে, সম্্রাটেরা দেশ পরিচালনার চেয়ে শিল্প-সাহিত্য চর্চায়ই বেশি মনোযোগী থাকতেন। আর, এই যুগে শিল্প-সাহিত্য সহ বিভিন্ন দিক থেকে কিয়োতো পরিণত হয় বিশ্বের এক বিখ্যাত শহরে। ১১৮৫ খ্রীঃ থেকে সম্রাটের নির্বাহী ক্ষমতা না থাকায় সম্রাট পান অফুরন্ত সময় যা তিনি ব্যয় করতেন শিল্প-সাহিত্য চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতায়।

সাধারণ জাপানিদের জিজ্ঞাস করলেও, পাল্টা প্রশ্ন হলো এত দীর্ঘতম বংশ তালিকা বা ঐতিহ্য কি আর কোন পরিবারেরআছে? যদি না থাকে, তাহলে সম্মান তো তিনি পেতেই পারেন। আর, এটাই যদি হয় সকল জাপানি নাগরিকের মনোভাব তাহলেতো তাও ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

অভিষেকের সময় নতুন সম্রাট নারুহিতো যেভাবে তার দেশ ও বিশ্বশান্তির আহবান জানালেন, তা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির উত্তালময় সময়ে তার প্রতি শুধু জাপানের নাগরিকদেরই শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করেনি বরং সারা বিশ্বের নাগরিকদের মাঝেও সেই শ্রদ্ধাবোধ ছড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তিনি এমনই এক সময়ে এ শান্তির ডাক দিলেন, যখন সেদেশের সরকার সংবিধানের ৯ম অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জাপানের যুদ্ধ করার অধিকার ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের প্রতিবেশী দেশগুলো বিশেষভাবে চীনের বিষয়ে তার আস্থা রাখতে পারছেন না, তাই তাদের আত্নরক্ষার অধিকার প্রয়োজন।

আত্নরক্ষার অধিকার জাপানের থাকতেই হবে, এতে কোন সন্দেহে নেই। তবে, খেয়াল রাখতে হবে গত কয়েক দশক ধরে জাপান তার বিদেশ নীতির কোমল ক্ষমতা কৌশলের মাধ্যমে যেভাবে সারা বিশ্বের মানুষের বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্রপিড়ীত মানুষদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন এবং তার মাধ্যেমে যে অসাধারণ ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন তাতে যেন ছেদ না পড়ে। তাই, বর্তমান বিশ্বের দীর্ঘতম উত্তারাকিরের ধারাবাহিকতার জাপানের নতুন সম্রাট যে শান্তির ডাক দিয়েছেন তা অত্যন্ত সময়োচিত। দীর্ঘজীবী হোন সম্রাট নারুহিতো; তুলে ধরুন বিশ্বশান্তির ঝান্ডা।

লেখক: শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট (আইএমএল), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :