ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির এপিঠ-ওপিঠ

মাসুদ কামাল
| আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১০ | প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৩০

আবরার ফাহাদ হত্যাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর শিক্ষার্থীরা যে দশ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তার মধ্যে তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিষয়টিও রয়েছে। গত বুধবার (৯ অক্টোবর, ২০১৯) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, তখনও প্রশ্ন আকারে বিষয়টি উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য ওনার মতামত দিয়েছেন, সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধের প্রস্তাব। তবে বুয়েট কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি তাদের পরিবেশকে সুস্থ রাখতে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তাহলে নিতে পারে বলেও মত প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু তারপরও থামেনি এ নিয়ে আলোচনা। বুয়েটের ঘটনায় যারা বিরক্ত, বীতশ্রদ্ধ, তারা বলছেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা। তারা মনে করছেনÑ ছাত্ররাজনীতি আছে বলেই এমন সব অঘটনের জন্ম হচ্ছে। এই যে আবরার ফাহাদ মারা গেল, তার পরিবারও কিন্তু এখানে ভিলেন হিসাবে হিংস্র সেই ছাত্ররাজনীতির ওপরই দায় চাপাচ্ছে। আবার ফাহাদের মৃত্যুর কারণ হিসাবে যাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদেরকে আটক করেছে পুলিশ, কি ভাবছে তাদের পিতামাতা বা পরিবার? স্বপ্ন ভেঙে গেছে তাদেরও। একটা খবরে দেখলাম, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আকাশ হোসেনের পিতার আহাজারি। তার পিতা জয়পুরহাটের ভ্যানচালক আতিকুর রহমানের সব স্বপ্নই এখন ভেঙে চুরমার। তিনি বলছিলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বাড়তি খরচ জোগাতে এলাকার অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। অনেক স্বপ্ন ছিল তার ছেলেকে নিয়ে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৃতীয় বর্ষে উঠে গিয়েছিল। আশা ছিল আর তো মাত্র কয়েক বছর, এর পর আর তাকে ভ্যান চালাতে হবে না। কিন্তু সে স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যতবার দেখা হয়েছে, পই পই করে বলে দিয়েছেনÑ রাজনীতিতে যেন না জড়ায়। গরিবের জন্য রাজনীতি নয়। সেই ছেলে কবে যে রাজনীতিতে ঢুকলো, সে জানতেই পারেনি। এখন স্বপ্ন পূরণ দূরে থাক, জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে। এলাকায় মুখ দেখাতেও পারেন না তিনি।

এরকম আরও অনেকের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। সবাই বলছেন, তাদের ছেলে তো এমন ছিল না। নিরীহ পড়ুয়া ছেলেটি কিভাবে এমন নৃশংস দানবে পরিণত হলো? সবই কি ছাত্ররাজনীতির কারণে? সেটাই যদি হয়, তাহলে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে তো আর বলার কিছু থাকে না। তাহলে কি ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দেয়াই শ্রেয়?

কেন মরতে হলো ফাহাদকে

ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনার আগে বরং আবরার ফাহাদের বিষয়টি একটু জানা যাক।  আসলে ফাহাদকে হত্যার পিছনের কারণটি কি ছিল? এটি এখন একটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। ফাহাদ কিন্তু সক্রিয় কোনো রাজনীতি করতো না। খুবই মেধাবী এবং পড়ুয়া টাইপের ছাত্র ছিল। তাই বলে একেবারে সমাজ বিচ্ছিন্নও ছিল না। দেশ নিয়ে ভাবতো, সমাজ নিয়ে ভাবতো। সে সব ভাবনা মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশও করতো। মৃত্যুর আগে সবশেষ যে স্ট্যাটাসটা ফেসবুকে ফাহাদ দিয়েছিল তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার ভারত গিয়ে যে সকল চুক্তি বা সমঝোতা করে এসেছেন, তা নিয়ে কিছু কথা ছিল। কথাগুলো কিছুটা সমালোচনামূলকই। তার লেখায় তথ্যের কিছু বিভ্রান্তি থাকলেও বুদ্ধিমত্তার ছাপও ছিল। তার এই স্ট্যাটাসটি পড়ে সরকার বা সরকারসমর্থিত কারও খুশি হওয়ার কোনো কথা নয়। আবার এই সমালোচনাটুকু পড়েই তাকে ‘ছাত্রশিবির’ হিসাবে আখ্যায়িত করা যায় বলেও মনে হয় না।

শিবিরÑ প্রসঙ্গটি এলো এ কারণে যে, ফাহাদ নিহত হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রথম যে খবরটি এসেছিলÑ বুয়েটে ছাত্রলীগের হাতে এক শিবিরকর্মী নিহত। যেন ফাহাদ আসলেই যদি শিবিরকর্মী হতো, তাহলে এই হত্যা একটা যথার্থতা পেত! হয়তো এ কারণেই, পুত্র হারানোর শোকের মধ্যেও ফাহাদের মা’কে বলতে শোনা গেছেÑ আমরা পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও আমার ছেলেকে কেন মারা হলো? রাজনীতিকরণ কত নিচে নেমে গেলে একজন মা’কে এমন উচ্চারণ করতে হয়!

তবে এর লাগসই উত্তরটা এসেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে। তিনি সরাসরিই বলেছেনÑ ‘মতবিরোধ থাকলেই একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে? আওয়ামী লীগ এটাকে সমর্থন করে না।’ সন্দেহ নেই, খুবই সেন্সেবল কথা। যে কোনো গণতান্ত্রিক দল এমন কথাই বলবে। কিন্তু ছাত্রলীগ কি এমন বিশ্বাস নিয়ে চলে? অন্তত নিকট অতীতে এমন সহনশীলতা কি দেখা গেছে তাদের আচরণে? এই তো কিছুদিন আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ছাত্রলীগের এক নেতাকে বলতে শুনেছিÑ নেত্রীর কোনো সমালোচনা তারা সহ্য করবেন না। এই কথাগুলো তারা বলেছিলেনÑ কোটা বাতিল আন্দোলনের একজন নেতাকে নির্মমভাবে পেটানোর পর, তাদের অপকর্মের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে গিয়ে। অতি সম্প্রতি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের প্রহার করা হলো। এর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা সেদিন এক টেলিভিশনেই বললেনÑ ওরা খালেদা জিয়ার পক্ষে স্লোগান কেন দিলো? খালেদা জিয়া একজন কনভিক্টেড আসামি, তার পক্ষে কোনো স্লোগান ক্যাম্পাসে সহ্য করা হবে না! এই যে কথা, এই যে গোয়ার্তুমি- এসবকে কি গণতান্ত্রিক আচরণ বলা যায়? ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সঙ্গে কি এসব কথা মোটেও সংগতিপূর্ণ? অথচ এমন সব আচরণ যেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের জন্য অতি সাধারণ এবং নিয়মিত ঘটনা। কেউ কেউ বলতে পারেন, মাত্রই কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে নজিরবিহীনভাবে তাদের পদ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তারপরও অন্যদের কেন শিক্ষা হয় না। কিন্তু একটা বিষয় তারা কি ভেবে দেখেছেনÑ ওই দুই নেতাকে কিন্তু অসহিষ্ণু বা অগণতান্ত্রিক আচরণের কারণে বের করে দেয়া হয়নি। তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে দুর্নীতির কারণে। ঠিক দুর্নীতির কারণেও বোধকরি নয়, দুর্নীতি করে ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে। ফলে ভিন্নমতাবলম্বীকে যে পেটানো যাবে না, তেমন কোনো মেসেজ তো ছাত্রলীগকে দেয়া হয়নি! ওই যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা বাতিলের আন্দোলন করার অপরাধে একজনকে প্রকাশ্যে মেরুদণ্ডে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হলো, ভয়াবহ সেই দৃশ্য প্রতিটি টেলিভিশনে দেখানো হলো, হয়েছে তার কোনো বিচার? ফাহাদের ঘটনাটিও তো তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। ওখানে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়েছিল, আর এখানে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে। এটা তো হাতুড়ির চেয়ে অনেক কম বিপজ্জনক। ঝামেলা করেছে ফাহাদ, সে মরে গিয়ে ছাত্রলীগের এই মেধাবী নেতা-কর্মীদেরকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। ফাহাদ যদি না মরতো, তাহলে কি এত কিছু হতো?

কিন্তু কারণটা আসলে কি ছিল? রাজনৈতিক মতবিরোধ, নাকি নিছকই র‌্যাগিং। ফাহাদ তো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই জড়িত ছিল না। তাহলে কি অরাজনৈতিক ব্যক্তির একটি রাজনৈতিক চিন্তার প্রকাশই ছাত্রলীগ নেতাদের উত্তেজিত করে তুলেছিল? অতি সামান্য সমালোচনা সহ্যের ক্ষমতাও কি তাদের লোপ পেয়েছে? তবে এই র‌্যাগিংটা কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই বুয়েটে বেশ বিকট আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে নানা কথা এর আগেও শোনা গেছে। বাড়তে বাড়তে এটা অনেক ভয়ংকর হয়ে গিয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে, ফাহাদের ক্ষেত্রে সমালোচনা সহ্য করার অক্ষমতা এবং র‌্যাগিংয়ের উদগ্র আকাক্সক্ষাÑ এই দুই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।   

দায়ী কে: ব্যক্তি নাকি রাজনীতি

ওবায়দুল কাদেরের কথাটাই না হয় আর একবার স্মরণ করা যাক। তিনি বলেছেন-ভিন্নমত প্রকাশ করলেই কাউকে মেরে ফেলা যাবে না, সেটা অপরাধ হবে। তিনি আসলে নীতি-নৈতিকতার কথা বলেছেন। পৃথিবীর সব জায়গাতেই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ভিন্নমতকে গুরুত্ব দেয়া। তিনি সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথাই বলেছেন। কিন্তু যা তিনি বলেছেন, তার চর্চা কি হচ্ছে এখন এই দেশে? হচ্ছে কি তার দলের মধ্যেও? চর্চা যদি মূল দলের মধ্যেই না হয়, তাহলে সেটা সহযোগী বা ভাতৃপ্রতিম সংগঠনের মধ্যেও থাকবে- তেমন আশাটা কি একটু বেশি হয়ে গেল না?

দেশে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল নেই- এ নিয়ে অনেককেই এখন এক ধরনের হা -হুতাশ করতে দেখা যায়। দেশে এখন বিরোধী দল বলতে যা বোঝায়, তাদের কর্মকাণ্ড যেন কেবল বিবৃতি আর সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমনকি তাদের তেমন কোনো রাজনীতি আছে বলেও মনে হয় না। এই যে পরিস্থিতি, এর পিছনে কি কেবল ওই বিরোধী দলগুলোর অযোগ্যতাই কাজ করেছে? সরকারের দমন-পীড়নও কি কাজ করেনি? রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে কি সরকারি দলের হয়ে কাজ করতে দেখা যায়নি? যাচ্ছে না? মূল রাজনৈতিক দল ও তার নেতাদের আচরণ তাদের অনুগত ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সংক্রমিত হবে- এ আর অস্বাভাবিক কি। অসহিষ্ণুতা তো তরলের মতোই নিম্নগামী। কাজেই এ নিয়ে বিস্মিত হওয়ার তেমন কিছু নেই। ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন বটে, কিন্তু নিজের দিকে তাকিয়ে বলুন তো, বিরোধী দলের কয়টা ভিন্নমতকে তারা সম্মান দেখিয়েছেন?

এই যে ফাহাদকে মেরে ফেলার পর শুরুতে তাকে শিবির হিসাবে চিহ্নিত করা, এটাও কি মূল দলের বড় বড় নেতাদের আচরণের প্রতিফলন নয়? বড়দের আচরণে এমন একটা ভাব কি প্রকাশিত হয়নি- জামায়াত-শিবির এতই খারাপ যে, তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করা অনেকটা বৈধই? সরকারি দলের কল্যাণে ‘জামায়াত-শিবির’ এখন একটা গালিতে পরিণত হয়েছে। এদের নিয়ে কথা যখন হচ্ছে, এমনকি এদের নাম যখন উচ্চারিত হচ্ছে তখন একটা বিতৃষ্ণা চোখে-মুখে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে- যেন এরা সাপের চেয়েও ভয়ংকর, ঘৃণিত।  এই আচরণ বা মনোভাবের সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিতর্কে আমি যাব না। আমার কেবল প্রশ্ন- সাপই যদি হবে, তাহলে সেই বিষাক্ত সাপকে মেরে ফেলা হচ্ছে না কেন? কেন তাকে জীবিত রেখে ঘরের মধ্যে অবাধে ঘোরাফেরা করতে দেয়া হচ্ছে। জামায়াত নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ অনেকবার উঠেছে, সরকার চাইলে একটা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেই তাদের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। যেমন অতীতে হিজবুত তাহরীরসহ অনেকের রাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না। তাদেরকে বৈধ করে রাখা হচ্ছে, আবার তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এতে ফলটা কি হচ্ছে? তাদের উপর চড়াও হওয়াটা যেন এক ধরনের বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। এই রাজনীতিকে ইতিবাচক বলতে হবে কোন বিবেচনায়?

জাতীয় জীবনের মতো, শিক্ষাঙ্গনেও এখন চলছে একচেটিয়া আধিপত্যের রাজনীতি। রাজপথে যেমন সরকারি দল ছাড়া আর কারও পদচারণার অধিকার শর্তসাপেক্ষ, শিক্ষাঙ্গনেও তেমনি। কেবল ছাত্রলীগ থাকবে, অন্য কেউ নয়। অন্য কাউকে থাকতে হলে ছাত্রলীগের সঙ্গে আপস করে থাকতে হবে। নইলে মার, বেধড়ক মার। সেইসব মার আবার হবে বিচারহীন, যে মারবে তার কোনো বিচার হবে না। বিচার সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নেবে না কোনো আইনি পদক্ষেপ। বরং যে হতভাগ্যকে মারা হলো, তার জন্য কেন এই প্রহারটা প্রয়োজনীয় ছিল, সে কতটা সরকারবিরোধী, কতটা জামায়াত-শিবির, সে কবে মৌলবাদী কোনো স্ট্যাটাসে লাইক দিয়েছিল- এসব নিয়ে বিশ্লেষণ চলতে থাকবে।

এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রকারান্তরে এটাই সম্ভবত সরকার সমর্থিত ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের বেপরোয়া হতে উৎসাহী করেছে। তাদের মধ্যে একটা ধারণা জন্মেছে- যা কিছুই করি না কেন, বিচার হবে না আমাদের। সাজা হবে না আমাদের। দু-একটা যে সাজা হচ্ছে- সে সব নিছকই ব্যতিক্রমী ঘটনা। ব্যতিক্রম তো আর নিয়ম নয়। নিয়ম হচ্ছে সাজা না হওয়া, প্রশ্নের মুখোমুখি পর্যন্ত না হওয়া। বরং উল্টো এ ধরনের দু-একটা ঘটনা ঘটাতে পারলে ‘ভাই’-এর কাছে গুরুত্ব বাড়বে। পরবর্তী কমিটি গঠনের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি: এপিঠ-ওপিঠ 

তাহলে কি ছাত্ররাজনীতির মধ্যে ভালো কিছুই নেই? তা কি করে হয়! সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেই কথাটিই বলেছেন। ছাত্ররাজনীতি বন্ধের প্রস্তাবগুলো তিনি দৃঢ়ভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। আসলে যারা বাংলাদেশের ইতিহাস জানেন, এই দেশের জন্মের এবং টিকে থাকার ইতিহাস জানেন, তাদের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আসাই স্বাভাবিক।

আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস ঐতিহ্যপূর্ণ। ছাত্ররাজনীতির এত সমৃদ্ধ ইতিহাস পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের আছে কি না সন্দেহ। যেমন ধরা যাক, সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা। সেই অন্দোলনের মূল শক্তিই কিন্তু ছিল ছাত্ররা। জাতির সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের সময় কোনো রাজনৈতিক দল কিন্তু মূল ভূমিকাটি রাখতে পারেনি। বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গঠন থেকে শুরু করে সরকারের বিরোধিতা, বিধিনিষেধ লঙ্ঘন- সব কিছুর সামনেই ছিল ছাত্ররা। আবার যদি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা বলি, সেখানেও ছাত্রদের ভূমিকা কিন্তু মূল রাজনৈতিক দলের প্রায় সমান্তরালেই দেখা গেছে। নানা কৌশলগত কারণে নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ যা করতে পারেনি, সে সব করেছে ছাত্রলীগ। একথা ঠিক যে, ছাত্রলীগের সে কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান তো ছিল ছাত্রলীগের ভূমিকাটিই। আবার ধরা যাক স্বাধীনতার পর এরশাদের সামরিক শাসনের পতনের আন্দোলনটির কথাই। এরশাদবিরোধী সেই আন্দোলনেও রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্রসংগঠনগুলোরও ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তেমন ভূমিকা রাখা ছাত্রসংগঠন কোথায় এখন ক্যাম্পাসে? প্রতিটি ক্যাম্পাসে বলতে গেলে এখন একটিই ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বলা হয়ে থাকে- এটিই দেশের সবচেয়ে বড় ছাত্রসংগঠন। কিন্তু দেশে ছাত্রদের অধিকার কিংবা দাবি-দাওয়া আদায়ে সবচেয়ে বড় এই ছাত্রসংগঠনের ভূমিক কতটুকু? নিকট অতীতের দিকে তাকালে আমাদেরকে হতাশই হতে হয় কেবল। এই সময়ের তিনটি ঘটনার কথা বলা যায়। কোটা বাতিলের আন্দোলন, রাজধানীতে সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ে আন্দোলন এবং অতি সম্প্রতি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন। এই তিনটি ঘটনাতেই ছাত্রলীগের কি ভূমিকা ছিল? বরং ভূমিকা ছিল অরাজনৈতিক ছাত্রদের। আর এই তিনটি আন্দোলনেই সাধারণ ছাত্রদের ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যায় ছাত্রদের দাবি-দাওয়া আদায় দূরে থাক, ছাত্রদের সাধারণ অনুভূতিকেই স্পর্শ করতে পারছে না ছাত্রসংগঠনগুলো। অথচ ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই কিন্তু ছিল সেটি। মূল লক্ষ্য থেকে এরা দূরে সরে গেছে। সরে গিয়ে সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করছে সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনে। ছাত্রদের চাওয়া-পাওয়ার দিকে নজর না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কি নির্মাণ বা সংস্কার কাজ হচ্ছে- সেসব ছাত্রলীগ নেতাদের নখদর্পণে থাকে। কোন কাজ কোন ঠিকাদার করছে, কিংবা কোন ঠিকাদারকে দিয়ে করাতে হবে- সেসবও জানে তারা। এছাড়াও বিভিন্ন তদবির, মন্ত্রণালয়ে বড় ভাইদের দপ্তরে নিয়মিত হাজিরা- এসব কাজেই তাদের সময় বেশি ব্যয় হয়।

কিন্তু ছাত্রসংগঠনের চরিত্র তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। আগে তো এমন ছিলও না। কেন এমন হলো? রাজনৈতিক দলগুলো, কিংবা এর কতিপয় নেতা কি তাহলে নিজেদের স্বার্থে ছাত্রসংগঠনকে এভাবে ব্যবহার করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যা-ই হোক, সাধারণ মানুষের দাবি একটাই, আর তা হলো- ছাত্ররাজনীতি যদি ছাত্রস্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকতে পারে, তাহলে সে রাজনীতির দরকার নেই। ছাত্ররাজনীতি যদি অর্থ, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে হয়ে থাকে, তাহলে সে রাজনীতির দরকার নেই। ছাত্ররাজনীতি যদি ছাত্রদের পিতামাতার জীবনে স্থায়ী হাহাকারের কারণ হয়, তাহলে সে রাজনীতির দরকার নেই।

কিন্তু ছাত্ররাজনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে আসার এই কাজটা করবে কে? ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছাত্ররা, নাকি তাদের নিয়ন্ত্রণকারী জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো? এই প্রশ্নগুলো নিয়েই এখন ভাবতে হবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :