‘অন্য দেশে দাফনে নিয়োজিতরা পায় স্যালুট, আমরা কষ্টও পাই’

বোরহান উদ্দিন
 | প্রকাশিত : ২০ এপ্রিল ২০২০, ০৮:১৯

মরদেহ দাফন-কাফনে দীর্ঘদিন ধরে নিরলস কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আল-মারকাজুল ইসলামী বাংলাদেশ। দেশে সম্প্রতি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফনেও এগিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। যখন নিজের স্বজনরাও করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকছেন তখন ধর্মীয় সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মরদেহ সমাহিত করছেন তাদের একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবক। তবে এই মরদেহ আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ নানাজনের কাছ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা ভালো আচরণ পান না বলে অভিযোগ আছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে ঢাকাটাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন আল-মারকাজুল ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামজা শহীদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার বোরহান উদ্দিন

ঢাকা টাইমস: এখন পর্যন্ত কতগুলো মরদেহ দাফন করেছেন?

হামজা: করোনা শুরুর পর থেকে ৭০টির বেশি মরদেহ আমরা দাফন করেছি। প্রতিদিনই আমাদের কাছে মরদেহ আসছে। দিনে দিনে সংখ্যা বাড়ছে। আজিমপুর, তালতলা কবরস্থানে এবং একজন হিন্দু ব্যক্তিকে শ্মশানে সমাধিস্থ করা হয়েছে।

ঢাকা টাইমস: আপনাদের স্বেচ্ছাসেবকরা কীভাবে নিজেদের সুরক্ষা করছেন?

হামজা: আমাদের মোট ১৫ জনের একটা টিম আছে। দুজন মহিলা বাদ দিয়ে। প্রয়োজন হলে আরও একজন নারীকে সঙ্গে নেয়া হয়। আমরা দুটি টিমে ভাগ করেছি। একটি টিম সকালে কাজ করে আরেক টিম দুপুরের পর। আমরা ওয়ানটাইম পিপিইগুলো ব্যবহার করি। আমরা এগুলো যথেষ্ট পরিমাণে পেয়েছি। আমরা বাইরে কাজ করি খুব হাই কোয়ালিটি পিপিই আমাদের দরকার নেই। পিপিই পরার পরে আমরা হ্যান্ড গ্লাভস, গাম বুট, সু-কাভার অর্থাৎ পুরোপুরি সুরক্ষিতভাবেই আমরা কাজটা করি।

ঢাকা টাইমস: নিজেদের সুরক্ষার পদ্ধতি কী?

হামজা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেরা একটি পদ্ধতি অনুসরণ করছি। প্রথমে ৬০% অ্যালকোহলের সঙ্গে ৪০% পানি মিশিয়ে তৈরি করা দ্রবণ মৃতদেহের গায়ে স্প্রে করা হচ্ছে। এরপর একটি পাম্পিং মেশিনের সাহায্যে মৃতদেহ প্রচুর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে এবং তার গোসল বা অজু সম্পন্ন করা হচ্ছে। দাফন বা সৎকার শেষে দলটি তাদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) সব পুড়িয়ে ফেলছে। একটি লাশ রেডি করতে ১০ থেকে ১৫মিনিট সময় লাগে।

ঢাকা টাইমস: কীভাবে এই মহামারির সময় দাফনের কাজটি শুরু করলেন?

হামজা: বিভিন্ন হাসপাতাল, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও যুগ্ম-সচিব স্বাস্থ্য সাইফুল্লাহ আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা মরদেহ সৎকারের পরিষেবা শুরু করি। আমরা হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রহণের পর সেটি দাফন পর্যন্ত সব কাজই করছি। করোনার রোগীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালকেরা এ কাজে সহায়তা করছেন।

ঢাকা টাইমস: কাজ করার ক্ষেত্রে আপনাদের কারা সহযোগিতা করছেন?

হামজা: ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস (আইসিআরসি) আমাদেরকে পলিথিন ব্যাগ, কাফনের জন্য কাপড় ইত্যাদি সরবরাহ করে আসছে। আমরা এই দুর্যোগের সময় সব থেকে বেশি স্মরণ করি এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক এমপি মুফতি শহীদুল ইসলামকে। কারণ তার উদ্যোগের কারণে আমরা সেবা দিতে পারছি। আমাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সালমান এফ রহমান আমাদের পুরো গাড়ির তেল, পেট্রোল যা লাগে সব তিনি দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে একটি গাড়ি দিয়েছেন। আরও গাড়ি দেবেন খুব শিগগিরই।

ঢাকা টাইমস: এই মুহুর্তে কোনো জিনিসের প্রয়োজনীয়তা আছে?

হামজা: সব থেকে বেশি প্রয়োজন বডি ব্যাগ। কম হলেও দুইশ বডি ব্যাগ রিজার্ভ রাখা দরকার। যা ছিল প্রায় শেষ। আর এক দুই দিনের মধ্যে ব্যাগ না পেলে দাফন কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হতে পারে। এছাড়াও অ্যালকোহল স্প্রের জন্য মেশিনের স্বল্পতা আছে। এগুলো পেলে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবো।

এছাড়াও আমাদের কুমিল্লার ব্রাঞ্চের গাড়িগুলো ঢাকায় নিয়ে এসেছি। আমাদের বিভিন্ন জায়গায় অনেক কর্মী ছিল চাইলে তাদের ট্রেনড করে কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু আমাদের ট্রান্সপোর্টের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।

ঢাকা টাইমস: বিশেষ কোনো ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন আছে কি না একটু বলেন।

হামজা: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় বেশ কিছু ট্রেনিং নেয়া হয়েছে। কিছু সিম্পল বিষয় আছে যেগুলো আমরা হ্যান্ডলিং করলে আমরা সহজেই কাজটা করতে পারব। ডব্লিউএইচওর ভাষ্য অনুযায়ী রোগী মারা গেলে তার শরীরে আর কোনো ভাইরাস থাকে না। মারা যাওয়ার পরে লাশ পেতে কিন্তু আমাদের ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কারণ আইইডিসিআরের রিপোর্ট আসতে সময় লাগে। আরও বিভিন্ন আনুসাঙ্গিক কারণ থাকে। তাই কাজটা আরও সহজ হয়ে যায়। যারা যাবে তারা শুধু পিপিইটা ভালো করে পরে নিলেই হয়। আর যে নির্দেশনা দেয়া আছে সেগুলো ফলো করলেই হয়। অর্থাৎ যে কেউ একটু সাহস করলেই কাজ করে ফেলতে পারবে।

ঢাকা টাইমস: কাজ করতে গিয়ে বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে কি?

হামজা: আমরা যখন একটা ডেডবডির কাছে যাই। তখন কাপড়টা অনেক নোংরা হতে পারে। তাই কাপড়টা কাটার পরে যখন স্প্রে করে হয়তো কাঁচিটা ফেরত দিতে যাই হাসপাতালের লোকজন বলে এটা ডাস্টবিনে ফেলে দেন। একটা সরকারি অফিসে যখন গাড়ি নিয়ে যাই তখন অফিসের লোকজন ড্রাইভারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং ড্রাইভারকে গালাগালি করে। অর্থাৎ তারা আমাদের কোনো হেল্প করে না। বহিবির্শ্বে কিন্তু তা নয়, তারা সবাই সবাইকে হেল্প করে। মানুষ যারা এই কাজ করছেন সেখানে সেনাবাহিনী, পুলিশ সবাই স্যালুট দিচ্ছে। আমাদের দেশের লোকজনের কাণ্ড দেখে স্বেচ্ছাসেবীরা মর্মাহত হয়, কষ্ট পায়।

ঢাকা টাইমস: এ ব্যাপারে পাঠকদের উদ্দেশে আপনি কী বলতে চান?

হামজা: কোনো লাশ যদি রাস্তায় পড়ে থাকে তাহলে ওই এলাকার মানুষ একটু সাহস করলেই হয়। যেমন পিপিই যদি নাও পায় তাহলে একটি প্লাস্টিকের বড় কাগজও যদি গায়ে জড়িয়ে লাশটাকে দাফন করে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ মারা যাওয়ার তিন থেকে চার ঘণ্টা পরে কোনো জীবাণু বেঁচে থাকে না-এটা বার বার বলা হচ্ছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে ভুল তথ্যগুলো যে ছড়াচ্ছে এগুলো যদি বন্ধ করা যেত তাহলে মানুষের ভীতিটা আরেকটু কমত। কারণ আমরা কিন্তু ইতিমধ্যে গোসল শেষে বেশ কিছু লাশ তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি। কোনো সমস্যা হয়নি। তাই করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে হুজুগে অনেক কথা হচ্ছে এসব মুর্খতার কাজ। উদার মনে এদের গ্রহণ করতে হবে।

ঢাকা টাইমস: আপনাকে ধন্যবাদ

হামজা: আপনাকেও ধন্যবাদ

(ঢাকাটাইমস/২০এপ্রিল/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ

শেখ হাসিনা আজ অনুকরণীয় বিশ্বনেতা: নানক

‘পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবো’

‘ই-ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিটে আগামীর বাংলাদেশের এক নবদিগন্ত উন্মোচন হবে’

পদ্মা ব্যাংকের লক্ষ্য ব্রাঞ্চলেস ভার্চুয়াল ব্যাংকিং

মানুষ মশারি ছাড়া ঘুমায় শুনে নিজেকে গর্বিত লাগে

‘এমআরপি এবং ওয়ারেন্টি নীতি বাস্তবায়ন হলে প্রযুক্তি ব্যবসায়ে শৃঙ্খলা ফিরবে’

শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও ভোটের মাঠে থাকবো: সালাহউদ্দিন

‘আজন্ম মানুষের সেবা দেয়াই আমার অঙ্গীকার’ পর্ব-২

‘জনপ্রতিনিধি না জনগণের সেবক হিসেবে থাকতে চাই’ (পর্ব-১)

জননেত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলে তৃণমূল সাজানো কঠিন হবে না

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :