‘অ্যাপে না, খ্যাপে যাব’

সিএনজি অটোরিকশা ভাড়ার ভোগান্তি এবার অ্যাপের মোটরসাইকেল সেবায়, অ্যাপে যেতে চান না সিংহভাগ চালক, সেই পুরোনো অযুহাত, ‘পোষায় না’

তানিয়া আক্তার ও সৈয়দ ঋয়াদ
 | প্রকাশিত : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ১১:১১

যাতায়াতের ভোগান্তির এই নগরে অ্যাপচালিত মোটরসাইকেল সেবাও কার্যত নষ্ট হয়ে গেল তিন বছর যেতে না যেতেই। মিটারের সিএনজিতে যে যাত্রী হয়রানি সেই একই চিত্র এখন মোটরসাইকেল ভাড়ায়।

অ্যাপে মোটরসাইকেল ভাড়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। বলা হচ্ছিল, যাত্রীর ইচ্ছামতো গন্তব্যে যাবেন চালকরা, ভাড়া ঠিক হবে অনলাইনেই। কিন্তু ‘পোষায় না’ অযুহাতে চালকরা শুরু করছেন জোচ্চুরি।

শুরুতে অ্যাপে যত ভাড়া আসে সেটা দেখে নিয়ে সেই ভাড়াতে অ্যাপ ছাড়া যাত্রীদের যেতে প্রস্তাব দিতেন বাইকারদের কেউ কেউ। এখন আর সেসবের ধারও তারা ধারছেন না। অনলাইনে রিকোয়েস্ট পাঠালে কল রিসিভ করেন না চালকদের বড় অংশ। যাত্রীরা কল করলেও শুনতে হচ্ছে, ‘যাব না’, ‘অ্যাপে না, খ্যাপে যাব’।

মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে লোকাল বাসের সহকারীদের মতো যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি করতে দেখা যায় দিনরাত। ‘কই যাবেন’, ‘যাবেন নাকি’- এই শব্দগুলো শুনে প্রায়শই বিরক্তি প্রকাশ করেন পথচারীরা।

ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চরম ভোগান্তির মধ্যে ২০১৬ সালে প্রথম অ্যাপের বাইক সেবা আনে স্যাম। এরপর একে একে আসে উবার, পাঠাওসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

তবে ওই বছরের শেষ দিকে অ্যাপভিত্তিক গাড়ি ভাড়া সেবা পাঠাও মোটরসাইকেল এবং পরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উবার প্রাইভেট কার ভাড়ার সুবিধা নিয়ে আসে। মুহূর্তেই তুমুল জনপ্রিয় হয় দুটি সেবাই। পরে দুটি অ্যাপেই মোটরসাইকেল ও গাড়ি ভাড়া সেবা চালু করে। একে একে চালু হয় ‘সহজ’, ‘ও ভাই’, ‘ইজি অ্যাপ’সহ আরও ১৪টি কোম্পানি।

গত ১ জুলাই থেকে অ্যাপে গাড়ি ভাড়া সেবা কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়। কথা ছিল, এরপর নীতিমালার বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

রাজধানীর বাংলামোটর বাস স্টপেজে বুধবার রাত ৯টার দিকে বেশ কয়েকটি বাইকের জটলা দেখা যায়। পথচারী এলেই রিকশাওয়ালাদের পাশাপাশি হাতে হেলমেট নিয়ে বাইক চালকদেরও ‘যাবেন নাকি’, ‘কই যাবেন’, কই ডাকতে দেখা যায়। হেঁটে যাওয়া নারী যাত্রীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান।

বিরক্ত জুলিয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এক সময় বাইকার দেখলে আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করত। চালকদের প্রতিও এক শ্রদ্ধা কাজ করত। আর এখন তো প্রায় প্রত্যেকটা মোড়েই এরা এমনভাবে ডাকে, কে রিকশাওয়ালা আর কে বাইকওয়ালা বোঝার উপায় নাই।’

এক বাইকারের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা গেল একজনকে। অ্যাপে ওই যাত্রীর রিকোয়েস্ট গ্রহণ করলেও ফোন দেননি বাইকার। যাত্রী নিজেই বেশ কয়েকবার কল দেন। হাসপাতালে তার বোন ভর্তি। যেতে হবে দ্রুত, কিন্তু ওই চালক অ্যাকসেপ্ট করার পর তা ক্যানসেলও করছেন না, ফলে নতুন করে রিকোয়েস্ট পাঠাতেও পারছেন না ওই যাত্রী। পরে মোড়ে এসে পেয়ে যান বাইকারকে। শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। একপর্যায়ে পাশের তিন-চারজন তাদের বাইকে চুক্তিতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। এতে আরও বিরক্ত হন ওই যাত্রী।

যাত্রীর নাম মিজান। ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ওরা এভাবে ডাকতে পারে না। এটার কোনো নিয়ম নাই। তাদের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই যাব না। কারণ, নিরাপত্তার একটা ব্যাপার। অ্যাপে গেলে সব রেকর্ড থাকে। কিন্তু তারা যে ছিনতাই করবে না, তার নিশ্চয়তা কী?’

বাইক অ্যাপে চালালে যে আয় খুব কম হয়, তা নয়। তবে মোট আয়ের ২০ শতাংশ কোম্পানিকে দিয়ে দিতে হয়। আর এটাকে অতিরিক্ত মনে করছেন বহু বাইকার।

যদিও কোম্পানি থেকে বাইকাররা বোনাস পান। আর এতে বেশ ভালো আয় হতো বলে বাইক চালাতে আগ্রহ বাড়তে থাকে। আর শুরুতে প্রধানত অল্প আয়ের চাকরিজীবী বা ছাত্ররা বা শিক্ষিত বেকার বাড়তি আয়ের জন্য বাইক চালালেও পরে রাইডার হিসেবে নিবন্ধনের স্রোত তৈরি হয়।

ফুটপাতের হকার, শ্রমজীবী এমনকি ঢাকার বাইরে থেকে দলে দলে লোক এসে বাইকার হিসেবে নিবন্ধন করতে থাকে। এমনকি অটো চালানো বাদ দিয়েও বাইকে যাত্রী টানা শুরু হয়। আর এরা যাত্রী টানা শুরুর পর থেকেই সিএনজির ভোগান্তি ধীরে ধীরে আসতে থাকে বাইকেও।

রংপুর থেকে ঢাকায় আসা এক বাইকার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রংপুরে থাকতাম। সাইকেল চালানোর অভ্যাস আছে। ঢাকায় বাইক চালালে লাভ আছে শুনে আসছি।’

গত কয়েকদিন ধরে বহুজনকে কল দিয়েও অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ায় যেতে রাজি করানো যায়নি। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই তারা রিকোয়েস্ট গ্রহণ করেন না, আর গ্রহণ করলেও কল দেন না, নিজেরা কল দিলেও তা রিসিভ করেন না।

কাকরাইল থেকে ইস্কাটনে আসবেন আল ফারুক। তিনি কয়েকবার চেষ্টা করার পর একজন বাইকার তার রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেন। কিন্তু তিনি কল করেননি ফারুককে। ফারুক একের পর এক কল করলেও তা রিসিভ করেননি বাইকার।

পথে আরেকজন বাইকার বললেন, ‘অ্যাপে না, খ্যাপে হলে যাব’। অ্যাপে রিকোয়েস্ট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই ‘কত নেবেন’ জানতে চান ফারুক। আর ওই চালক দুই কিলোমিটারের জন্য ভাড়া চাইলেন ১০০ টাকা।

পরে হেঁটেই চলে গন্তব্যে আসলেন ফারুক। এসে দেখেন, তিনি যে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন, সেখান থেকে ভাড়া দেখানো হয়েছে ৮১ টাকা। অথচ তাকে শুরুতে সম্ভাব্য ভাড়া দেখানো হয়েছিল ৫০ টাকা।

অর্থাৎ ফারুকের রিকোয়েস্ট গ্রহণ করে ওই বাইকার চুক্তিতে আরেকজন যাত্রী বহন করেছেন। কিন্তু অ্যাপ কোম্পানি জেনেছে তিনি অ্যাপের যাত্রী বহন করছেন।

কারওয়ানবাজার মোড়ে সোনারগাঁও হোটেলেরর সামনে দাঁড়িয়ে পাঠাওয়ের বাইকের জন্য অনুরোধ পাঠিয়েছেন আব্দুল হালিম। কিন্তু অনলাইনে বাইক পাচ্ছিলেন না। রাস্তা পার হয়ে জাহাঙ্গীর টাওয়ার নিচে আসতেই একদল মোটরবাইক চালক তাকে ঘিরে ধরে।  জিজ্ঞেস করতে থাকে, ‘কোথায় যাবেন ভাই?’

হালিম জানতে চান, কেউ আ্যপে যাবে কি না? কিন্তু রাজি হয়নি বাইকারদের কেউ।

ঢাকাটাইমসকে হালিম বলেন, ‘এখন অ্যাপে বাইক পাওয়া যায় না। সবাই চুক্তিতে যেতে চায়। তাদের নাকি পোষায় না।’

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী লিজা আক্তার বলেন, ‘বেশিরভাগ বাইকার চুক্তিতে যেতে চান। অনেকেরই পেশাদারিত্ব নেই। এমন হলে আ্যপের সুবিধা হারাবে নগরবাসী।’

বাইকাররা কী বলছেন?

বাংলামোটর মোড়ে যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি করতে দেখা গেল বরাতকে। অ্যাপে যান না কেন?- এমন প্রশ্নে পাশে দাঁড়ানো অন্য বাইকারদের জটলা দেখিয়ে বলেন,  ‘এই যে দেখাতাছেন। এখানকার অনেকেই গ্রাম থিকা আসছে। এত বাইক হওয়ায় ট্রিপ পাই কয়টা? তাই ডাইকা লোক নেয়ন ছাড়া উপায় নাই।’

চুক্তিতে যাওয়ার কারণ, অ্যাপের চেয়ে ৫০ থেকে ৭০ টাকা বেশি নিয়ে থাকেন বাইকাররা। ঠিক মিটারের সিএনজিচালদের অভ্যাস।

ফার্মগেটের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকার মোজাম্মেল বলেন, ‘চুক্তিতে আগেই বেশি বলে নিই, যাতে ভাড়া নিয়া গ্যাঞ্জাম না লাগে। আবার মাঝে মইধ্যে অনেকক্ষণ ট্রিপ না পাইলে একটু বেশিই ভাড়া চাই। নাইলে তো পোষাবে না।’

রামপুরা ব্রিজের কাছে হাতিরঝিলের সংযোগ সড়কটি রীতিমতো বাইক স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। সেখানে যাত্রীর জন্য অপেক্ষায় থাকা মফিক বলেন, ‘একশ টাকার খ্যাপ মারলে কোম্পানি নিয়ে যায় ২০ টাকা। তেল খরচ হয় আরও ২০ টাকা। তাহলে আমাদেরতো কিছুই থাকে না।’

‘প্রায় এক বছর ধরে রাইড শেয়ার করছি। তবে গত তিন মাস হাতে গোনা কয়েকটা রাইড অ্যাপসে গেছি, আর বাকি বেশিরভাগ গেছি চুক্তিতে।’

গুলশান-১ গোলচত্বরে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা রফিক বলেন, ‘চুক্তিতেও নেই, আ্যাপেও যাই। এক কিলোমিটার বা দুই কিলোমিটার পথ গেলে অনেক সময় একশ টাকা বিল আসে। এত বেশি ভাড়া আসলে যাত্রীদের সঙ্গে হাতাহাতি হয়ে যায়। এই কারণে আ্যপে যেতে চাই না। অনেকে মনে করে চুক্তিতে বেশি ভাড়ার জন্য যাই, এটা কিন্তু ঠিক না।’

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে সারাক্ষণই বাইক চালকরা বাসের হেলপারদের মতো উচ্চস্বরে ডাকতে থাকেন। কয়েকটি বাইক সবসময়ই একসঙ্গে রাখা থাকে। বাকিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে দাঁড়ানো। বাসের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী দেখতে পেলেই প্রায় প্রত্যেকেই বাইক রেখে যাত্রীর পিছু নেন। দরদাম ঠিক করেন।

বাইকারদের নিয়ন্ত্রণ করছিলেন আলমাস খান নামে একজন। তার আওতায় শতাধিক বাইক চলে বিভিন্ন বাসস্টপেজে। এভাবে যাত্রা তো যাত্রীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ- এমন প্রশ্নে তিনি, ‘কোন সমস্যা নাই। আমার আন্ডারে ১২০ টার মতো বাইক আছে বিভিন্ন জায়গায়। যদি কোন যাত্রীরা কোন প্রকার সমস্যায় পড়ে এখানে এলে জানালেই হবে। কিন্তু ওই যে আশে পাশে অনেক দেখাতাছেন ওদের দায়িত্ব আমাদের না।’

অপরিচিত যাত্রীদের এভাবে ডেকে নিয়ে বাইকাররাও কি নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছেন না?- জবাবে সাহেদ মিয়া নামে এক বাইকার বলেন, ‘ঢাকা শহরে এমন হয় না। আর আমি তো মেইন রোডেই থাকি। গলিতে যাই না।’

কিন্তু আপনাদের তো অ্যাপে চলার কথা, অন্যভাবে যাত্রী নেয়া তো আইনবিরুদ্ধ- এমন মন্তব্যে কথা ঘুরে গেল সাহেদের। দেন অযুহাত।

‘এই তো ফোনে এমবি নাই। কয়েকদিন আগে অ্যাপসও ডিলিট করে দিছিলাম। এখন তাড়াহুড়া আছে। তাই যাইতেছি।’

বিড়ম্বনায় সাধারণ বাইক মালিকরা

ডাকাডাকির কারণে যারা অ্যাপ ইনস্টল করেননি, এমন বাইকাররা আছেন বিড়ম্বনায়। যেমন শিহান। বলেন, ‘আগে বাইক থাকা যেমন একটা প্রেস্টিজিয়াস ব্যাপার ছিল। এই রাইড শেয়ারিং অ্যাপে এসে এটা আর নাই। এখন বাইক নিয়ে দাঁড়ালেই যে কেউ জিজ্ঞেস করে যাবেন নাকি? এটা খুবই অস্বস্বস্তির ব্যাপার।’

বাইকারদের দাঁড়িয়ে থাকায় যানজটও হচ্ছে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক কনস্টেবল মো. জিয়া বলেন, ‘রিকশাওয়ালাদের তো হাওয়া ছুটাইয়া দিই। বাইকারদের তো এমনিতেই কিছু বলা যায় না।’

ঢাকাটাইমস/২৩আগস্ট/টিএ/এসআর/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত