নরকে আলিঙ্গন

শাম্মী তুলতুল
 | প্রকাশিত : ০৬ অক্টোবর ২০২০, ১৪:০৮

ঘুম থেকে উঠে যে খবরটি পাওয়া গেলো কমল দেশের বাইরে চলে যাবে। বিয়ের পরের দিন এমন খবর শুনতে নিশ্চয় কোন নবাগতা স্ত্রীর ভালো লাগার কথা নয়। সিলেট শ্রীমঙ্গলের চমৎকার প্রকৃতির কথা শুনেছে তুলি তার বেড়াতে আসা বান্ধবী নব দম্পতিদের কাছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে কমলা রঙ্গের আলো ঝলমল করছে। জানান দিচ্ছে তোমাদের স্বাগতম। কিন্তু সব গুড়েবালি।

এরই মধ্যে হোটেল কর্মচারী এসে বেড টি দিয়ে গেলো।

বিষয়টা বুঝলাম না তুলি বলল।

কমল বিরক্তির স্বরে বলে, এতে বোঝার কি হলো। আমি তো হুট-হাট।

তাই বলে এই সময়ে?

ওহ তুলি টু মাচ। এতো পড়াশোনা করে প্লীজ সেকেলে ভাব নিওনা।

এটা একটা আনন্দ। চিরাচরিত। কিছুই তো আলাপ হয়নি কাল।

হয়নি হবে। যা বলার এসেই বলবো। বাট নাউ নো আরগু।

তুলির আরও বলতে ইচ্ছে করল। কিন্তু কমলের কথার ধরনে সাহস পেলোনা ।

স্যার গাড়ি রেডী বলে হোটেল কর্মচারী বাইরে থেকে হাক দিলো।

কোটটা হাতে নিয়ে কমল বলল, যাচ্ছি ডিয়ার তোমার সব ঠিক করে দিয়েছি। একটু পর টিকেট তোমার হাতে চলে আসবে।

কমল চলে গেলো। তুলি হা করে তার চলে যাওয়া দেখে রইল।

যাওয়ার পর তুলি বার বার ঢোক গিলছিল। ঢোক গিলতেও পারছে না ঠিক মতো। কষ্ট হচ্ছে। গালে হাত দিয়ে ভাবছে। কি হচ্ছে এসব। আমার জীবনটাও কি হুট-হাট হয়ে গেলো? মেলাতে পারছিনা কেন। ভাবতে ভাবতে পেছনের দিকে ফিরে গেলো সে।

আপনার চাকরিটা কি খুব প্রয়োজন?

প্রয়োজনে আছে বলেইতো সবাই কাজ করে স্যার। তুলি জানতো এখানে যারা ইন্টার ভিউ দিচ্ছে সবার বায়োডাটা স্যারের জানা। কিন্তু এটা ভুলেও অনুমান করতে পারেনি এতো পরীক্ষার্থীর ভিড়ে চাকরিটা এতো সহজে কিভাবে হয়ে গেলো। ভেবেছিল হয়তো রক্ষণশীল মনোভাব আর সৌন্দর্য তাকে এগিয়ে নিয়েছিল।

আপনার সব কিছু যাচাই বাছাই করেছি। সবারটাই করেছি। তবে আপনাকে আপনার স্ট্যাটাস অনুযায়ী ভালো লাগলো। এতো সমস্যার মধ্যেও আপনি উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছেন দেশের বাইরে থেকে।

জী বাবার কারণে।

আপনার কৃষক বাবা আপনাকে মেয়ে হিসেবে না দেখে সন্তান হিসেবে দেখেছেন তাকে স্যালুট জানাই। যাই হোক কাল থেকে জয়েন করুন।

ধন্যবাদ স্যার।

ওয়েলকাম।

তুলির এখন পোয়াবারো। এগোতে ঠেকায় কে। প্রতিদিন তার নতুন লাগে। কমল প্রতিদিন তাকে এস এম এস করে। খেয়েছ কিনা। ঘুমিয়েছ কিনা। আজ কি পরেছ ইত্যাদি। তুলিও উত্তর দেয়, প্রশ্ন করে। এভাবে তাদের প্রেমের গতি ছড়ায়। ছড়াতে ছড়াতে এক সময় প্রেমের দ্বিতীয় ধাপ বিছানায় গড়ায়। তারপর ধাপ তৃতীয় বিয়ে। কিন্তু প্রেমের পর বিয়েটা খুব কঠিন হয় অনেকের কাছে। প্রেম করা যত সহজ বিয়ে ওতো সহজ না।

বিয়ের কথা শুনে চমকে ওঠে কমল।

আমাদের ক্যারিয়ার পড়ে আছে। সামনে অনেক কিছু করা বাকি। এতো জলদি বিয়েটা না করলে কি হয় না?

নারী যখন তার জীবন-যৌবন তার প্রিয় মানুষকে সপে দেয় তখন সব ঝাপসা দেখে, রাগ করোনা। ভয় পাই তোমাকে হারানোর। প্লীজ ভুল বুঝনা।

ওকে গিভ মি সাম টাইম। দেখি কি করা যায়।

দিন যায় রাত হয়। আবার ভোর। কি করা যায় এই কথা আর সামনে এগোইনা। ওইদিন পর্যন্তই থেমে গেলো।

প্রতিদিন অফিস ছুটিতে কফি শপে আর যাওয়া হয় না তাদের। প্রচুর পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে সম্পর্কে।

তুলিকে দেখেও না দেখে এমন ভানে রোজ অফিস থেকে বের হয়ে যায় কমল। অনেক সময় ছুটির আগেও চলে যায়। কল দিলে রিসিভ করে না। তুলি মনকে বোঝায়, একটু রিলাক্স এ থাকতে দেই কিছুদিন।

কিন্তু সময় গড়ায় কমলের সাড়া নেই।

অবশেষে একটা সময় তুলিও অধৈর্য হয়ে পড়ে। একদিন তুলি পাগলের মতো কমলের বোর্ড মিটিং এ ডুকে গেলে কমল চমকে ওঠে।

কমল বলে, কি সমস্যা?।

কথা আছে তোমার সাথে।

এখন তো সময় না। তুমি বলে দাও কখন সময়?

মিটিং শেষ করি তারপর। কমল তুলির এমন আচরণে একটু ভয় পেয়ে গেলো। গলার টাইটা একটু নাড়াচাড়া করল। মিটিং শেষ করে কমল আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না তুলিকে ডেকে পাঠাল। তুলি গলা ঝেড়ে তার রুমে ডুকল।

বস। কেমন আছ?

যেমন রেখেছ। তুলির কথায় অনেক ক্ষোভ সেটা কমল অনায়াসে বুঝতে পেরেছে।

হুম। মন দিয়ে শোন তোমাকে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলা হয়নি।

তুলি কপাল কুচকে বলে কেমন?

আমি শারীরিক ভাবে অসুস্থ। ইয়ে, মানে আমার দুটো কিডনীই নষ্ট।

মানে?

মানে হলো, অকেজো দুই মূল্যবান বস্তু নিয়ে বাঁচার লড়াই করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

কি বলছো এসব?

কমল ডেস্ক খুলে কিছু কাগজপত্র বের করে বলল, যদি বিশ্বাস না হয় এগুলো দেখো, কাগজগুলো বাড়িয়ে দিলো তুলির সন্মুখে।

তুলি তাকায় কমলের দিকে। একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, আগে তো কিছুই বললে না। বলতে বলতে তুলির চোখ দিয়ে টপ টপ পানি গড়িয়ে পড়ল।

চিন্তা করোনা। ডোনার খুঁজছি, পেয়েও যেতে পারি।

তুলি অবাক এমন একটা সুস্থ মানুষ কত অসুস্থ বোঝায় গেলো না।

তুলি মুহূর্তেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল তার একটা কিডনী কমলকে দিয়েই দিবে।

তুলি বলে, ডোনার লাগবে না। আমারটা দেখো।

না না এ হয় না।

তোমার জন্য জীবন দিতেও রাজী কমল।

নিজে শেষ হলাম তোমাকেও...

তুলি কমলের মুখ থেকে কথা কেঁড়ে নিয়ে বলল, আমি তুমি একই কথা। বিয়ে করে তোমার হয়ে তোমার সেবা করতে চাই। কমল স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে বিয়ের প্রসঙ্গটা তুলি এড়িয়ে যেতে দিবে না। নিজের স্বার্থের জন্যে হলেও এই কাজ করতে হবে তাকে।

শেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বিয়ের আগে সব প্রসেসিং হয়ে গেলো। তুলির অপারেশন সাকসেস ফুল হলো। এদিকে কমলও সুস্থ স্বাভাবিক। কথামতো বিয়ের কাজটাও সেরে ফেলল কমল। কিন্তু একটা ফোন আসার পর পরই বিয়ের পরের দিন তুলিকে রিসোর্টে রেখে চলে গেলো। হোটেল কর্মচারী দরজায় কড়া নাড়তেই তুলি সম্বিৎ ফিরে পেলো। অতীত থেকে বেরিয়ে এলো।

লোকটির চাহনি তুলির ভালো লাগল না। তাকে যেতে বলল সে। তার মনে হলো যেন লোকটা ভাবছে, কেনা জিনিস ব্যবহার করে ফেলে দিয়ে চলে গেছে কেউ।

লোকটি যাওয়ার আগে বলল, ম্যাডাম আপনার জন্য স্যার একটা ফাইল রেখে গেছেন। তুলির হাতে ফাইলটা সপে দিয়ে সে চলে গেলো। ফাইল উল্টাতে প্রথম পৃষ্ঠা পড়েই তুলির চোখ কপালে।

তাতে লিখা ছিল “তোমাকে আমার সম্পদের অর্ধেক মালিক করে গেলাম, ডিভোর্স পেপারটা সই করে দিও। ভালো থেকো। পারলে ক্ষমা করিও”।

মাথায় হাত দিয়ে তুলি অনেকক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক পর মনে মনে বলল, কিন্তু কেন? কেন এই নীরব প্রতারণা, আবার করুণাও। কি অপরাধ ছিল আমার, এই প্রশ্নের উত্তরতো যে কেউ জানতে চাইবে। আমারও চাই।

তুলি আর দেরি না করে বসা থেকে দাড়িয়ে গেলো।

চোখের পানি গড়ানো থামিয়ে দু, হাত দিয়ে চোখ মুছে ফেলল।

তরিঘড়ি করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। জীবনের সাথে বড় ধরণের মশকরা হয়েছে যা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। ঢাকা নেমে বাসায় না গিয়ে সোজা কমলের অফিসের পা রাখল। কমলের রুমে ঢুকতে দেখলে কমলের পি এস বললেন, স্যার তো বের হয়ে গেলেন একটু আগে।

কোথায় গেলো।

বাড়ির দিকে। তার স্ত্রী খুব অসুস্থ।

স্ত্রী? তুলি পি এসের দিকে কটমট চোখে তাকায়। তুলির সাথে আসলে কি হচ্ছে সে বুঝতেই পারছে না। স্বপ্নের মধ্যে নেই তো সে। এসবতো সিনেমাকেও ভেদ করে যাচ্ছে। যতটুকু বেঁচে যাওয়া আশার আলো দেখতে পেল তার গণ্ডিও শেষ হয়ে গেলো। আকাশ যেন তার মাথায় চুরমার হয়ে ভেঙ্গে পড়ল।

তার স্ত্রী বহুদিন যাবত কিডনী রোগে আক্রান্ত। তাকে দেখতে দেশের বাড়ি গিয়েছেন স্যার।

তুলি নিজেকে একটু স্থির করলো। ভেতরের রাগটা ভেতরে রেখে শান্ত মেজাজে বলল, একটা উপকার করবেন।

জী বলুন। দেশের বাড়ির ঠিকানাটা দেওয়া যাবে?

নিষেধ আছে।

আপনার ক্ষতি হয় এমন কিছু করব না।

ঠিক আছে। স্যার যেন কিছু জানতে না পারে।

তুলি মাথা নেড়ে সায় দিলো।

ঠিকানা পেয়ে বাসার দিকে চলে গেল। যেতে যেতে ভাবল কতো বোকা বনে গেলাম। এতো বড় ধোঁকা খেলাম এতো বড়? এর চেয়ে বড় ধোঁকা কি আর কারো সাথে হয়েছে কিনা কে জানে? পৃথিবীর খবরতো আমার জানা নেই। কারো সাথে হয়েছে কিনা কিভাবে জানবো। এভাবে জপতে জপতে সারা রাত পার করলো তুলি। পরের দিন সকাল সকাল ময়মনসিংহ যাত্রা করলো। বুকে প্রচুর সাহস জমিয়েছে সে কমলের মুখোমুখি হওয়ার। লোকজনকে তার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে তারা কমলের বাড়িটি দেখিয়ে দেয়। একটু সামনে গিয়ে ডানে যেতেই একটি লোহার গেট। গেটে ঢুকতেই কমলকে দেখতে পেলো সে। একটি শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। আর হাসছে। কারো জীবন নষ্ট করে, সারাজীবনের জন্য হাসি থামিয়ে দিয়ে কমল হাসছে। বাহ! কি নিষ্পাপ হাসি। কমলের সামনাসামনি এসে দাঁড়ালো তুলি। চমকে গেলো সে। রীতিমতো ভড়কে গেলো। এতো জলদী তুলির মুখোমুখি হবে আশা করেনি। তবে প্রস্তুত ছিল। তুলি ফোফাতে লাগলো। নাক মুখ ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, কেন এমন করলে আমার সাথে? কেন? চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।

কমলের স্ত্রী তার কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন। তুলির থুঁতনিটা ধরে বললেন, ওর কোনো দোষ নেই যা বলার আমাকে বল। তুলি ফ্যাল- ফ্যাল করে তাকায় উনার দিকে। কমলের স্ত্রী এক গ্লাস পানি খেতে দিয়ে চেয়ারে বসালেন তুলিকে।

বলেন, আমি অভাগা পোড়াকপালি বিয়ের পর থেকে একটা বাচ্চার জন্য বুকটা হাহাকার ছিল। যখন সাত বছর পর সে আশা পূর্ণ হলো আমার কিডনী দুটোই অকেজো হয়ে গেলো।সুখের মুহূর্তে নিজের সুখ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। কমল ডোনারের আশায় বহু ছুটলেও নিয়তি সঙ্গ দিল না। এরপর ইন্টারভিউয়ের বাহানা করল। সবার পুরোপুরি জীবন বৃত্তান্ত নেওয়া হলো। ওখানে শুধু তোমারটাই মিলে গেলো। ব্যাস প্রতারণার সব কৌশল আমরা অবলম্বন করলাম।

আমাকে ক্ষমা করো না কিন্তু আমার স্বামীকে ক্ষমা করে দিও। তুমি ডিভোর্স দিতে না চাইলে না দাও। আমার আপত্তি নেই। প্রায়শ্চিত্ত জরুরি। করতে চাই আমি। আমরা দুজনেই ওর জীবনে থাকবো। আমার ছোট বোন হয়ে তুমি থাকবে। আমার কিছু হয়ে গেলে আমার সন্তানকে তুমি লালন পালন করবে। খুব আশ্চর্য হচ্ছে তুলি, একটা জীবন নষ্ট করে কি সহজ- সুন্দর সাফাই দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আর আমি কিছুই বলতে পারছি না। করতে পারছিনা কিছুই। তুলি কমলের স্ত্রীর হাত সরিয়ে নিলো তার হাত থেকে। অস্থির মন নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল ।

সোজা গেটের দিকে এগোতে লাগল। পিছন ফিরে কমলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, তোমার সাথে একদিন নরকেও আলিঙ্গন হবে। শুরু থেকে শেষপর্যন্ত কমল তুলিকে কিছুই বলতে পারলনা। কিন্তু তার ছল ছল চোখ দুটো অনেক কিছুই বলতে চাইলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :